বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৩৭ পূর্বাহ্ন

বন্ধু হওয়ার পর শুরু হয় কথোপকথন!

বন্ধু হওয়ার পর শুরু হয় কথোপকথন!

খায়রুল আলম রফিক :
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সার্বক্ষণিক সচল। নামে-বেনামে একাধিক আইডি। এসব আইডিতে টিকটক-লাইকি’র ভিডিও আবার কখনও ছোট ছোট নাটকের লিংক শেয়ার করা হয়। মডেলিং ও অভিনয়ে সুযোগ দেয়া হবে এমন চমকপদ বিজ্ঞাপনও দেয়া হয়। টার্গেট করা হয় শহর বা গ্রামের ফ্যাশনেবল, উচ্চাভিলাষী মেয়েদের। তারপর ফেসবুকে পাঠানো হয় বন্ধু হওয়ার আমন্ত্রণ। বন্ধু হওয়ার পর শুরু হয় কথোপকথন। একপর্যায়ে গড়ে উঠে সখ্য।

প্রস্তাব দেয়া হয় র‌্যাম্প মডেল হওয়ার। বিভিন্ন কাজে সুযোগের আশ্বাস দেয়া হয়। আগ্রহী তরুণীদের নেয়া হয় বিভিন্ন পার্টিতে। একসময় ওই তরুণীদের জীবনে নেমে আসে সর্বনাশ। সম্প্রতি র‌্যাম্প মডেল তৈরির নামে এভাবেই কিছু প্রতারক স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কিশোরী-তরুণীদের সর্বনাশ করছে। মডেলিংয়ে সুযোগতো দেয়া হয়ই না, উল্টো কোনো কোনো তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। আবার বিদেশে পাচার করা হয় এমনও অভিযোগ আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে এ ধরনের প্রতারক চক্রের কয়েক সদস্য গ্রেপ্তারের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

ফেসবুকের মাধ্যমে টাঙ্গাইলের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিচয় হয় ইয়াছিন সাগর নামের এক যুবকের। ইয়াছিন একজন ডিজে বয়। পরিচয় হওয়ার পর তাদের মধ্যে নিয়মিতই কথাবার্তা হতো। একপর্যায়ে ইয়াছিন তাকে র‌্যাম্প মডেল বানানোর স্বপ্ন দেখায়। সেও রাজি হয়ে যায়। স্বপ্নে বিভোর কিশোরীকে স্বপ্ন পূরণে বাড়ি ছাড়ার পরামর্শও দেয় ইয়াছিন। এরপর ২৯শে সেপ্টেম্বর থেকে নিখোঁজ হয়ে যায় ১৬ বছর বয়সী কিশোরী। অনেক খোঁজাখুঁজি করে সন্ধান না পেয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় একটি জিডি করেন তার বাবা। জিডি’র সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার রমনা ডিভিশনের ধানমন্ডি জোনাল টিম। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে ১৪দিন পর ডিবি সোমবার তাকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে উদ্ধার করেছে। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকায় ডিবি ইয়াছিন সাগর (৩০) ও আঞ্জুমা হোসেনকে (৩০) গ্রেপ্তার করেছে। ডিবি জানিয়েছে, ফেসবুকে পরিচয় হয়েই ইয়াছিন এই শিক্ষার্থীকে মডেল বানানোর স্বপ্ন দেখায়। দেশে-বিদেশে কাজ করে রাতারাতি সে জনপ্রিয় হয়ে টাকা আয় করবে- সেই লোভ দেখানো হয়। অথচ প্রতারকের মূল পরিকল্পনা ছিল বিদেশে কাজ করার কথা বলে তাকে পাচার করে দেয়া।

১১ই সেপ্টেম্বর গাজীপুরের একটি রিসোর্টে পার্টির আয়োজন করে হৃদয় নামের এক যুবক। ওই অনুষ্ঠানে টার্গেট করে বেশকিছু অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই অনুষ্ঠানে কলেজপড়ুয়া দুই তরুণীও ছিলেন। তারা ফেসবুকে পরিচিত হওয়া এক বন্ধুর মাধ্যমে দাওয়াত পেয়ে অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। ওই বন্ধু তাদেরকে হৃদয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তরুণীরা নিজে কিছু করার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে জেনে হৃদয় তাদের আশ্বস্ত করে বলে তাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিবে আর মডেল হিসেবে সুযোগ দিবে। দু’দিন পরেই তরুণীরা হৃদয়ের এক বান্ধবীর মাধ্যমে তার কুঁড়িলের বাসায় আসে। টিকটকের ভিডিও বানানোর শুটিং হবে এমন আশ্বাসেই হৃদয় তার বাসার নিচতলায় জায়গা দেয়। এরপরই হৃদয় দুই তরুণীকে ধর্ষণ করে। এর কয়েকদিন পরে ২০শে সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টিকটক ও লাইকিতে অভিনয় ও মডেলিংয়ের সুযোগ দেয়া হবে এমন বিজ্ঞাপন দেখে আরও দুই তরুণী হৃদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে। একই কায়দায় শুটিংয়ের প্রলোভন দেখিয়ে তাদেরকেও বাসায় নিয়ে আসে। পরে তাদেরকেও হৃদয় ধর্ষণ করে। এভাবে চার তরুণীকেই হৃদয় বাসায় আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছে। পরে ধর্ষণের শিকার এক তরুণীর অভিযোগের ভিত্তিতে ভুক্তভোগী চার তরুণীসহ আরও এক তরুণীকে হৃদয়ের বাসা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। কুঁড়িলের পিনাকল পাম্পসংলগ্ন ৮৫ নম্বর বাসা থেকে পুলিশ হৃদয়কেও গ্রেপ্তার করেছে। পুলিশ জানায়, শহর ও গ্রামের উচ্ছাভিলাষী তরুণীদের টার্গেট করতো হৃদয়। যাদের অভিনয় ও মডেলিংয়ে আগ্রহ আছে। এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়ে তাদেরকে ধর্ষণ করতো হৃদয়। পুলিশ হৃদয়কে সিরিয়াল রেপিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

গোয়েন্দাসূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি চক্র কিশোরী-তরুণীদের মডেল ও অভিনয়ে সুযোগ দেয়ার নাম করে নানাভাবে প্রতারিত করছে। নানা প্রলোভন দেখিয়ে তাদের জিম্মায় নিয়ে বাসায় আটকে রেখে ধর্ষণ করছে। আবার অনেককে বিদেশে পাচার করে দিচ্ছে। এ ধরনের চক্রের সদস্যদের ধরার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ধানমন্ডি জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. তরিকুর রহমান  বলেন, স্কুল-কলেজপড়ুয়া কিশোরীদের টার্গেট করে তাদেরকে র‌্যাম্প মডেল বানানো হবে এমন প্রলোভনে কিছু প্রতারক তাদের সর্বনাশ করছে। টাঙ্গাইলের ওই কিশোরী দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার মা একজন স্কুল শিক্ষিকা। তাকে ওই প্রতারক এমনভাবে প্রলুব্ধ করেছিল সে বাধ্য হয়েই বাড়ি থেকে বের হয়ে এসেছে। ইয়াছিন ওই কিশোরীকে বলেছে বিদেশে কাজ করার প্রস্তাব এসেছে তার জন্য। এজন্য সে বড় অংকের টাকাও পাবে। তিনি বলেন, এ ঘটনায় মামলা হবে টাঙ্গাইলে। রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে এর আগে আর কারো সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে কি না সেটি জানা যাবে।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest