রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২০, ০১:১০ অপরাহ্ন

পার্টির আড়ালে অনৈতিক কাজ

পার্টির আড়ালে অনৈতিক কাজ

বিশেষ প্রতিনিধি :
তথ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন মানবজীবনকে নানা ক্ষেত্রেই সহজ করলেও এর অপব্যবহারে ভয়ঙ্কর বিরূপ প্রভাব পড়ছে সমাজে। জীবনমান সহজ করার পাশাপাশি সুস্থ বিনোদনের জন্যও যেসব প্রযুক্তিপণ্যের উদ্ভাবন হলো, একশ্রেণির মানুষ সেগুলোর নেতিবাচক ব্যবহারেই বেশি আগ্রহী।

এসব প্রযুক্তিপণ্যের নেতিবাচক ব্যবহার এতটাই বিপর্যয়ে গিয়ে ঠেকেছে যে, টিকটক ও লাইকি অ্যাপস ঘিরে আয়োজন করা হয় সুইমিং পার্টি, যার আড়ালে রয়েছে দেহব্যবসা। এসব পার্টিতে যোগ দেয়া তরুণ-তরুণীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ঠিক করে রাখা হয় বিশেষ কক্ষও।

বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী প্রতিটি দেশেই আলোচিত ‘টিকটক’ ও ‘লাইকি’ অ্যাপসের নেতিবাচক ব্যবহার নিয়ে চলমান তীব্র সমালোচনার মধ্যেই ভারতের পর গতকাল পাকিস্তানেও অশ্লীল ও অনৈতিক কন্টেন্ট ঠেকাতে অ্যাপসটি নিষিদ্ধ করে পাকিস্তান টেলিকমিউনিকেশন অথরিটি (পিটিএ)।

অথচ টিকটক ও লাইকি অ্যাপসের মাধ্যমেই খোদ রাজধানীতেই সিরিয়াল ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পরও এবং দেশের বর্তমান ডিজিটাল আইনে নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও অবাধেই এসব অ্যাপসের ব্যবহার করে চলছে উঠতি বয়সি তরুণ-তরুণীরা। যে কারণে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা। সংঘটিত হচ্ছে কিশোর গ্যাং।

এরও বেশকিছু দিন আগে মানুষকে বিনোদন দেয়ার জন্য কিছু উঠতি বয়সি তরুণ প্র্যাঙ্ক নামক অপসংস্কৃতির চালু করেছিল। যা মানুষের হয়রানির খড়গে পরিণত হয়েছিল। যদিও প্র্যাঙ্ক বন্ধে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের হলেও শুনানি পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত সুস্থ বিনোদন ও সমাজের নানা ইতিবাচক চিত্র উপস্থাপনের জন্য তৈরি হলেও টিকটক ও লাইকির মতো তথাকথিত অ্যাপসগুলোর মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে নানা ধরনের সস্তা, অশালীন ও অনৈতিক কনটেন্ট। এসব কনটেন্টের অশালীন উপস্থাপনা ও আচরণ শিশু-কিশোরসহ সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে নেতিবাচক ও বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে।

এসব অ্যাপসে সস্তা কনটেন্টের অভিনেতা-অভিনেত্রীরা নিজেদের ফলোয়ার তথা অনুসারীদের অবস্থান ধরে রাখা ও সংখ্যা বাড়াতে গিয়ে পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে।

এর মধ্যে রাজধানীর উত্তরার আলোচিত অপু ও প্রিন্স মামুনের অনুসারীদের মধ্যে কয়েক দফায় ঘটা বড় ধরনের মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনা অন্যতম। বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ ওঠায় অপু ও মামুনসহ বাংলাদেশি চারটি আইডি লাইকি কর্তৃপক্ষ বাতিল করলেও এখনো এসবের অপব্যবহার চলছেই।

এছাড়াও অপু গ্রেপ্তারের পর সমালোচিত টিকটক অ্যাপ থেকে সোস্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া সব ধরনের অশালীন কনটেন্ট বা ভিডিও সরিয়ে ফেলা এবং এগুলো তৈরিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারকে আইনি নোটিসও পাঠানো হয়।

 

যদিও এখন পর্যন্ত বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আগের মতো সরবই রয়ে গেছে টিকটকাররা। যে কারণে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থার পাশাপাশি উঠতি বয়সিদের আচরণের ওপর এখনই নজরদারি না বাড়ালে এ ধরনের অপরাধের মাত্রা আরও অধিক হারে বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন অপরাধ বিজ্ঞানীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ গবেষক তৌহিদুল হক আমার সংবাদকে বলেন, টিকটক ও লাইকির মতো অ্যাপসগুলো ইতিবাচক কাজের জন্য তৈরি হলেও রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও সামাজিক শিষ্টাচারের ঘাটতি থাকায় আমরা বরাবরের মতো নেতিবাচক কাজে ব্যবহার করছি। এর প্রভাবে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের গ্যাংভিত্তিক কিশোর অপরাধসহ অন্যান্য অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের পোশাক, চাল-চলন, আচার-ব্যবহার, চুলের কাটিং কেমন হবে— সে বিষয়ে পরিবার ও সমাজের নজরদারি থাকা উচিত। এছাড়া পরিবারবঞ্চিত শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সহযোগিতা ছাড়াও বিভিন্ন এনজিও এগিয়ে এলে অপরাধ হ্রাস করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, ১৮ বছরের আগের কিশোর-তরুণদের উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন পণ্যের ব্যবহার থেকে সরিয়ে রাখতে পরিবারকে জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।

এছাড়া এসব অ্যাপসের মাধ্যমে নেতিবাচক ব্যবহার বন্ধ করে সমাজ ও বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে দেশীয় মূল্যবোধের নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে ভালো কনটেন্ট তৈরির দিকে তরুণ সমাজকে আগ্রহী করা গেলে বর্তমানে চলমান নেতিবাচক অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব হবে।

এদিকে টিকটক ও লাইকির কনটেন্ট নিয়ে সমালোচনার পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সি মানুষ এসব মাধ্যম ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করছেন। বেশির ভাগ ভিডিওর কনটেন্ট অত্যন্ত নিচুমানের ও অশালীনতাপূর্ণ।

 

আবার এসব সস্তা কনটেন্টের অনুসারীদের বেশির ভাগ নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে আসা। টিকটক ও লাইকিতে নিজেদের অবস্থান প্রথমদিকে রাখতে ও ফলোয়ার সংখ্যা বাড়াতে তথাকথিত এসব ‘সেলিব্রেটি’ প্রায়শই উসকানিমূলক ভিডিও শেয়ার করছেন।

এতে বিভিন্ন সেলিব্রেটিদের অনুসারীদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বড় ধরনের মারামারি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। গুলিস্তানে মামুনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে টিকটকার অপুর অনুসারীদের মারধরের অভিযোগের মধ্য দিয়েই এসব সংঘর্ষের তথ্য প্রকাশ্যে আসে।

পরবর্তী সময়ে মামুনের অনুসারীরাও অপুর অনুসারীদেরও মারধর করেছিল। মূলত অপু ও মামুনের অনুসারীদের এ সংঘর্ষের মাধ্যমেই টিকটক ও লাইকির নেতিবাচক ব্যবহারের তথ্য প্রকাশ পায়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির আমার সংবাদকে বলেন, দেশে ডিজিটাল সিকিউরিটির যে আইন রয়েছে সে আইনে এসব অ্যাপস এলাউ না। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনটি করা হয়েছে মূলত এ সমস্ত সাইবার ক্রাইম মোকাবিলা করার জন্য।

সাইবার ক্রাইম যেনো না হয় সেজন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের অধীন এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। যেহেতু ডিজিটাল আইন বিরোধী সেহেতু এসব অ্যাপস নিষিদ্ধের ব্যাপারে বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে আনা যেতে পারে। এছাড়া আলোচনা-সমালোচনা যেহেতু শুরু হয়েছে সেহেতু আশা করি কেউ না কেউ খুব দ্রুতই বিষয়টি উচ্চ আদালতের নজরে আনবেন।

টিকটক ও লাইকি অ্যাপসের মাধ্যমেই কখনো মডেল কখনো পরিচালক সেজে কিশোরীদের অভিনয়ের ফাঁদে ফেলে মডেল বানানোর কথা বলে সিরিয়াল ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটেছে।

হূদয় নামের এক যুবক বিভিন্ন প্রলোভনে উঠতি বয়সি পাঁচ কিশোরীকে গত মাসে ধর্ষণ করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার শিকার এক ছাত্রীর ভাটারা থানায় করা অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত হূদয়কে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ।

অভিযোগে বলা হয়, গত ১৬ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কুড়িলে অভিযুক্তের বাসায় সিরিয়ালে চার ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়। পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযোগের সত্যতাও স্বীকার করেছে টিকটক হূদয়।

পুলিশ বলছে, পাশবিকতার শিকার ছাত্রীদের তিনজন কলেজ এবং একজন স্কুলের ছাত্রী। তাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় থাকে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের পর ক্রমিক ধর্ষক (সিরিয়াল রেপিস্ট) বলে দাবি করে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, হূদয় গত ১২ সেপ্টেম্বর বন্ধুদের নিয়ে টিকটক-লাইকি অ্যাপসের মাধ্যমে গাজীপুরের একটি রিসোর্টে সুইমিং পার্টির আয়োজন করে। সেখানে পরিচয়ের সূত্রে দুই কলেজ শিক্ষার্থী মডেল হওয়ার আগ্রহ দেখায়।

এর দুদিন পর হূদয়ের এক বান্ধবীর মাধ্যমে তারা কুড়িলে হূদয়ের বাসায় আসে। টিকটকের শুটিং শুরু হওয়ার কথা বলে তাদের ওই বাসার নিচতলার একটি কক্ষে থাকতে দেয়া হয়। এরপর ওই ছাত্রীদের ওপর পাশবিকতা চালায় সে।

অন্যদিকে, ফেসবুকে ‘টিকটক ও লাইকিতে অভিনয়ের সুযোগ দেয়া হচ্ছে’— এমন বিজ্ঞাপন দেখে গত ২০ সেপ্টেম্বর আরও দুই শিক্ষার্থী হূদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাদেরও শুটিংয়ের কথা বলে সে নিজের বাসায় রেখে পরদিন সকালে তাদের মধ্যে একজনকে বাসার তৃতীয় তলায় নিয়ে পাশবিকতা চালায়।

ওই রাতেই আরেক শিক্ষার্থীর ওপর চলে পাশবিকতা। এভাবে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চার শিক্ষার্থীকে নিজের বাসায় আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে হূদয়।

পুলিশের গুলশান বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, ঘটনার শিকার তরুণী ও কিশোরীরা উচ্চাভিলাসী। তারা ভিডিও শেয়ারিং সাইট টিকটক ও লাইকিতে অভিনয়ের চেষ্টা করছিল। কেউ আবার মডেল হতে আগ্রহী। হূদয় ওই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে। ধর্ষণের পর তাদের নানা ভয় এবং মডেল বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে নিজের বাসায় আটকে রাখা হতো।

মডেল হওয়ার স্বপ্নে এবং আতঙ্কে তারা মুখও খুলতো না। হূদয়ের টার্গেট ছিলো রঙিন দুনিয়ার স্বপ্নে বিভোর তরুণী ও কিশোরীরা। এরকম অসংখ্য ঘটনা ঘটছে আইনে নিষিদ্ধ টিকটক ও লাইকি অ্যাপসের মাধ্যমে।

ডিজিটাল আইনে নিষিদ্ধ টিকটক ও লাইকি অ্যাপসের মাধ্যমে অশ্লীল অনৈতিক কনটেন্টের প্রচার ও অবাধ ব্যবহারে বাড়ছে অপরাধ, ঘটছে সিরিয়াল ধর্ষণের ঘটনাও। তীব্র সমালোচনার মধ্যেই ভারতের পর পাকিস্তানেও নিষিদ্ধ করা হয়েছে টিকটক।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest