হোমপেজ সম্পাদকীয় মহামারী করোনা : অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত —– এস এম...

মহামারী করোনা : অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যত —– এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার

125
0

“দুর্ভিক্ষ শ্রাবস্তীপুরে যবে/জাগিয়া উঠিল হাহারবে/,
বুদ্ধ নিজভক্তগণে শুধালেন জনে জনে/ক্ষুধিতেরে অন্নদানসেবা /তোমরা লইবে বল কেবা?’/ শুনি তাহা রত্নাকর শেঠ/করিয়া রহিল মাথা হেঁট।/কহিল সে কর জুড়ি, “ক্ষুধার্ত বিশাল পুরী,/এর ক্ষুধা মিটাইব আমি /এমন ক্ষমতা নাই স্বামী”!
যখন মানবতার বিপর্যয় বা করোনা মহামারী চলছে তখন রবীন্দ্রনাথের অবিনাশী কবিতা আমাকে বার বার আহত করছিল এই জন্য যে,
আমরা অভ্যস্ত হয়েছি এ বিশ্বাস নিয়ে সৃষ্টির যা কিছু পরিবর্তন হয় তা মানুষের মঙ্গলে বা কল্যানের স্বার্থেই হয়। কল্যানে হোক সেটাই চাই কিন্তু অকল্যাণের মুক্তির জন্য মানবজাতি যে খুব বেশি প্রস্তুত নয় তা আমরা বুঝলাম যখন এসে বিশ্ব বর্তমান সময়টাতে করোনার সাথে যুদ্ধ করছে ; তাকে ঠেকানোর জন্য প্রতিরোধ করার জন্য। সেই সাথে প্রতিশেধক আবিস্কারে গবেষণায় ব্যস্ত বিশ্বখ্যাত এক ঝাঁক নবীন প্রবীন বিজ্ঞান কর্মি।

পৃথিবী এসে রীতিমত আটকে গেছে সময়ের বির্বতনে । তাও আবার যে যেখানে আছে সেখানেই। চলমান  বর্তমানে খুব  একটা দেখা না দিলেও সহজে অনুমেয় এই মহামারি বা মানবিক বিপর্যয়  গড়াতে গড়াতে পৃথিবীকে খাদ্য সংকটের মুখোমুখি করে আরো দুর্বল করে ফেলতে পারে। সে বিষয় মাথায় রেখে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় আনতে হবে ব্যাপক পরিবর্তন। খাদ্যাভ্যাসেও আসবে কিছু পরিবর্তন, যা পুরাতনের অনিবার্য পরিবর্তনেই সৃষ্টি হবে। নতুন খাদ্য সংস্কৃতি অতপর এটি নতুন করে পথ চলতে থাকবে দীর্ঘ পথ।

মহামারী এই পৃথিবীতে নতুন কিছু নয়। সৃষ্টির শুরু থেকেই সময়ে সময়ে এই পৃথিবীতে  নেমে আসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মহামারী। যেমন ১৬৬৪ সালে  লন্ডন শহরে গুডওমেন ফিলিপ্স নামে এক ইংরেজ মহিলা তার নিজ গৃহে হঠাৎ মৃত্যুর পর  পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখা গেল  সেই ইংরেজ মহিলা আক্রান্ত হয়েছিলেন প্লেগে। সঙ্গে সঙ্গে সে বাড়িটি সিলগালা করা হয়েছিল।  ১৬৬৪ সালে প্লেগ রোগটির শুরু এভাবেই এবং  কিছু লোকের প্রাণহানি হলো প্লেগে। ১৬৬৫  প্লেগ রোগটি মহামারি আকার ধারণ করেছিল এমন করে রোগটি শুরু হওয়ার পর থেকে ১৮ মাসে  মধ্য শুধুমাত্র লন্ডন শহরে মৃতের সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকম বেড়ে দাঁড়ালো ১ লক্ষে যা তখনকার সংখ্যায় লন্ডন শহরের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ প্রায়। শুধু তাই নয় যুগে যুগে  লক্ষ কোটি মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়েছে  মানবিক বিপর্যয়ে বা মহামারীতে।  অনেক পন্ডিত  বা মুণীষী ব্যাক্তিও  আক্রান্ত হয়েছেন এসব রোগে।অনেকেই  ছিলেন কোয়ারেন্টাইনেও বা গৃহবন্দি হয়ে। ফ্রান্সের রাজা অষ্টম চার্লস, খ্রিষ্টোফার কলম্বাস, হার্নেন কার্তেজ, লিও তয়েস্তয়, নিৎসে, বদলেয়ার, মোপাঁসা, জার্মান কবি হাইনরিক হাইনে, মুসোলিনী, হিটলার, লেলিন, বিখ্যাত ডাচ চিত্রকর রামব্রেন্ড সহ শরৎ চন্দ্র ও রবি ঠাকুর পর্যন্ত। সেই মনবিক বিপর্যয়ের দিনগুলিতে তাঁদের  রচনা বিশ্বসাহিত্যে অনন্য স্থান করে নিয়েছে।

বলার বিষয় শেক্সপিয়র,  নিউটনের এই অনিচ্ছা নির্বাসন  বিশ্বসাহিত্য  তাঁদের জন্য আশির্বাদ ছিল। জেফ্ররি চসার তার বিখ্যাত লেখা ‘দ্য ক্যন্টারবারি টেলস্’ মেরি শেলী’র উপন্যাস ‘ফ্রাঙ্কেস্টাইন’র  ‘দ্য বেল জার’  উইলিয়াম কেনেডির ‘আয়রণউইড’। আইরিস লেখক জেমস্ জয়েসের  ‘উইলিসিস’ এমন মহামারী বা মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যেই লিখেছেন। বিশ্ব বিখ্যাত ইডিপাস নাটকেও আমরা পেয়েছি এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় বা মহামারীর কথা। এই গ্রন্থগুলি যুগে যুগে মহামারী বা মানবিক বিপর্যের অখন্ড  দলিলও বটে  । তাঁরা  সাহিত্যসৃষ্টি বা সাহিত্য কর্মের মধ্যদিয়ে এতটুকু জানান  দিয়ে গেছেন যুদ্ধ মানব সভ্যতার জন্য কখনোই কল্যাণকর নয়, বিধায় যুদ্ধ খাতে অর্থ ব্যয় কম করে স্বাস্থ্য খাতে অর্থ ব্যয় বেশি  করেই মানব সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখার জয়গান গেয়েগেছেন। তা যদি আমরা যথার্থ রপ্ত করতে পারতাম তাহলে আজকের এমন মানবিক বিপর্যয় এমন পরিসরে  নাও ঘটতে পারতো।  

বলে রাখা দরকার গত ৭ এপ্রিল ‘নিরাপদ থাকুক কর্মরত পুলিশ সদস্যরাও’ শিরনামে দৈনিক ও অললাইনে  একটি লিখা প্রকাশিত হয়েছিল ,  তাতে ছোট্ট একটি আর্জি রেখে বলার চেষ্টা করেছি  ডাক্তার  নার্সদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যরাও রাতদিন মানবতার এই বিপর্যয়ে লড়াই করে যাচ্ছে। পুলিশ সদস্য’রাও নিরাপদ হোক সেইফটি ফার্ষ্ট নীতি অনুসরণ করে।

বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষে তৎকালীন  পুলিশ প্রধান  মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে কিছু অর্থ জমা করেছেন। সত্যিই খুব প্রসংসনীয় ভূমিকা এবং তাতে বাংলাদেশ পুলিশ আজীবন সমাদ্রিত হবেন। স্যারের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। সেই সাথেই যদি নিজ সদস্যদের প্রোরক্ষার বিষয়টি আর একটু গুরুত্ব দেয়া যেত সেক্ষেত্রে ধারাবাহিকতায় এতদিনে এসে বাস্তবায়নও পূর্ণতা পেত এমনকি কৃতকাজটি তাঁর জন্য বয়ে আনত ইতিহাসের অনন্য উচ্চতা। ফল স্বরুপ পেশাগত দায়িত্ব পালন কালে পুলিশের যে সংখ্যক সদস্যরা করোনা আক্রান্ত হয়েছেন সংখ্যাটি আরও কম হতে পারতো যা তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতারই জয়গান হতো, বেড়ে যেত সেবাদাতা সদস্যদের মনোবল। 

যাহোক মহামারী কালীন পন্ডিতগনের লেখা গ্রন্থাদি সাক্ষ্য দিচ্ছে সুদূর অতীতেও মহামারী দেখা দিয়েছে প্রাণহানি ঘটেছে তার মাঝেও তাঁরা মানবতার জয়গান গেয়েছেন। যুগে যুগে  মানবিক বিপর্যয়  ছিল, আছে থাকবে তার পরেও মানব সভ্যতা কিন্তু বিলীন হয়ে যাবেনা।  আমরা আশাবাদী হতাশাগ্রস্থ নই কোনভাবেই। বিশ্বনেতাদের  মাথানূয়ে পড়লেও বিজ্ঞান কিন্তু বসে নেই,তাদের শ্রম বৃথা যেতে পারেনা সে প্রত্যাশাই দৃঢ়। আমরা ধরেই নিতে পারি খুব শীঘ্রই করোনার প্রতিশেধক বা ভ্যাকসিন আবিস্কার হবে। কিন্তু তা যথাযথ সম বন্টন হবে কি না তা নিয়ে শংকাও কম নয়। 

বাজার অর্থনীতি’র চরিত্র বলে ধনী রাষ্ট্রগুলি তা দখলে নেওয়ার  জন্য অপ্রত্যাশিত প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে পারে। সেটিও ভেবে দেখার প্রয়োজন এখনি। অন্যথায় পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার কারনে আরও একটা মানবিক বিপর্যয় দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায়না। প্রযোজ্য ক্ষেত্রে  অর্থনীতিতে পুজিবাঁদ আর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনার যৌক্তিক সমন্বয়ে নতুন কিছু বাজার বৈশিষ্ট্য অভিযোজিত করার প্রয়োজন হত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে