হোমপেজ সম্পাদকীয় সারা জীবন ধরেই কী চলবে ট্রাফিক পুলিশের দু:খ?

সারা জীবন ধরেই কী চলবে ট্রাফিক পুলিশের দু:খ?

66
0

খায়রুল আলম রফিক:

ঢাকা মহানগরীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে যানজট নিরসনে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্য পিযুষ। সমস্যা পাহাড় সমান। আর তার সামনে তাদের মত কয়েকজন মানুষ দায়িত্ব পালন করছেন এখানে। অস্ত্র বলতে ছোট্ট একটা বাঁশি। তা নিয়েই সমস্যার সমাধানে কাজ করে চলেছেন। হাইড্রোলিক হর্ন, দ্রুতগতির যানবাহন, বেপরোয়া গতি, হুটার, বিকন লাইট, উল্টো পথে চলাচল এবং মোটরসাইকেলের আরোহীদের হেলমেটসহ সব ধরনের ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন পিযুষের মত ট্রাফিক সদস্যগণ। জেব্রা ক্রসিং এর আগে Stop লাইন বরাবর গাড়ি থামানো এবং স্টপেজ ছাড়া যত্রতত্র গাড়ি থামানোর বিরুদ্ধেও কাজ করছেন তারা। ট্রাফিকের পোষাক পরিহিত ঠোঁটে বাঁশি নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা পিযুষ যানবাহন আসা যাওয়ার সময় অনিয়ম দেখে অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দারাও পিযুষের মত ট্রাফিক পুলিশদের অসহায়তার কথা স্বীকার করে আফসোস করেন। সত্যিই তো জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনের এই সমস্যা কী কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব? সারা জীবন ধরেই কী চলবে ট্রাফিক পুলিশের দু:খ?

রোদ-বৃষ্টি কিংবা ঝড়-তুফানেও ডিউটি মাফ নেই ট্রাফিক পুলিশের। একটু অন্য মনষ্ক হলেই গাড়ির চাকা থমকে যায়। লেগে যায় যানজট। ধুলো-বালি আর কালো ধোঁয়ার ভেতর রাস্তায় দাঁড়িয়ে অবিরাম বাঁশি ফুঁকে, হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করাই ট্রাফিক পুলিশের কাজ। তারপরও নেই কাঙ্ক্ষিত ছুটি। নেই তেমন সামাজিক মর্যাদাও। দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রমের পর শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পুলিশের এ বিশেষ বিভাগের সদস্যরা চাকরিজীবন শেষ করেন। ট্রাফিক সার্জেন্ট রানা জানান, আমাদের ডিউটির চাপ বেশি। আমাদের চাকরি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাস্তায়ই ডিউটি পালন করতে হয়।

জানা গেছে, ট্রাফিক পুলিশের সাপ্তাহিক ছুটি নেই। প্রতিদিনই রাস্তায় ডিউটি করতে হয়। ট্রাফিক পুলিশের ওই সদস্যরা সপ্তাহে একদিন ছুটির দাবি করেন। ধুলো-বালি আর গাড়ির কালো ধোঁয়ার মধ্যে টানা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ডিউটি করতে গিয়ে নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন ট্রাফিক কনস্টেবল ও সার্জেন্টরা। তাদের মধ্যে শ্বাসকষ্ট রোগীর সংখ্যা বেশি। অবসরে যাওয়ার পর তারা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওই রোগে ভুগতে থাকেন। কাশ-জ্বর লেগেই থাকে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কোমর ও মেরুদণ্ডের ব্যথা শুরু হয়। ডিউটি শেষ করে ব্যারাকে ফিরে গরম পানি দিয়ে স্যাঁকা দিতে হয় কোমরে। চিকিৎসকরা জানান, দীর্ঘদিন ধুলো-বালির মধ্যে ডিউটি করলে শেষ জীবনে অসুস্থ হয়ে পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। ধুলো-বালির সঙ্গে গাড়ির কালো ধোঁয়া ফুসফুসে নানা জটিলতা সৃষ্টি করে। ব্রঙ্কাইটিসসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। এছাড়া একনাগাড়ে দীর্ঘদিন দাঁড়িয়ে ডিউটি করায় মেরুদণ্ডের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়াটা খুবই স্বাভাবিক। এ দু’টি উপসর্গ ট্রাফিক পুলিশের বেলায় প্রযোজ্য।

বিড়ম্বনার শেষ নেই ট্রাফিক পুলিশের। এরপরও দায়িত্ব পালন করেই যেতে হয় তাদের। প্রাকৃতিক হোক আর মানবসৃষ্টই হোক, যেকোনও দুর্যোগেও দায়িত্ব পালনে কোনও বিরতি নেই। ধুলো-বালি আর রোদ-বৃষ্টিতে অক্লান্ত পরিশ্রমের পরও ট্রাফিক জ্যামের জন্য অপবাদ শুনে যেতে হয় নীরবে। দিন-রাত রাস্তায় থাকার কারণে নানা রোগেও আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। এরমধ্যে সাইনোসাইটিস, শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা সারাবছরই লেগে থাকে তাদের। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা জানান এসব তথ্য।

রাস্তায় দায়িত্ব পালনের সময় আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেও সমস্যা। প্রায় প্রতিদিনই প্রভাবশালীরা উল্টো পথে যাতায়াত করেন। কাগজপত্রসহ নানা কারণে যানবাহন আটকালেই শুরু হয়ে যায় তদবির। প্রভাবশালীরা হুমকি-ধামকি দেওয়া শুরু করেন। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে চাকরি খাওয়ারও হুমকিও দেন তারা। দিতে থাকেন নানা অপবাদ। মামলা করলে বলা হয় ‘ঘুষ’ না দেওয়ায় মামলা দেওয়া হয়েছে। মামলা না করলে বলা হয় ‘ঘুষ’ নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।

বিমানবন্দর থেকে শহীদ জাহাঙ্গীর গেট, ফার্মগেট, সোনারগাঁও, শাহবাগ, মৎস্য ভবন, কদম ফোয়ারা, পুরোনো হাইকোর্ট হয়ে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত ভিআইপি সড়কের ইন্টারসেকশনগুলোতে রিমোট কন্ট্রোল সরবরাহ নিশ্চিত করে স্বয়ংক্রিয় ও রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে সিগন্যাল পরিচালনা করা হচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্যরা জানান, চাওয়া মাত্র কাগজপত্র দেখাতেও অনীহা চালক ও মালিকের। আইনের দুর্বলতার কারণে যানবাহনের চালকরাও থাকেন বেপরোয়া। আইন না মানাকে তারা গর্বের কাজ বলে মনে করেন। এমন বহুমুখী সংকটের মধ্যেই দায়িত্ব পালন করে যেতে হচ্ছে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের। কনস্টেবল ও সার্জেন্টরা আট ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করলেও ইন্সপেক্টর থেকে ওপরের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালন করতে হয় ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা।

অনেকেই নাম প্রকাশ করতে অনীহা প্রকাশ করে বলেন, ছুটি নেই। কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি নেই। সামাজিক মর্যাদাও নেই। দিন-রাত পরিশ্রমের পরও কোনও ধন্যবাদ নেই। দুর্ঘটনাসহ নানা ঝুঁকি তো আছেই। এরপরও যানজটের জন্য নিত্য গালমন্দ শুনতে হয় সাধারণ মানুষের। যানজট না থাকলে সেই কৃতিত্ব আর ট্রাফিকের থাকে না। অনেকেই অবর্ণনীয় কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়েন।

ট্রাফিক কনস্টেবল পিযুষ জানান, ২৭ বছর যাবৎ ট্রাফিকে কর্মরত আছি। ছুটি না থাকায় বাসায় খেতে পারি না। হোটেলে খেতে হয়। তাই রোগ-ব্যাধি আমাকে ছাড়ে না। কর্মঘন্টার সময় সীমা না থাকায় পরিবার-পরিজনদের সময় দিতে পারি না। অসুস্থ থাকার পরও মানুষের সেবাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, এখন পর্যন্ত যানজট সহনশীল রেখেছি। তবে জনগণের প্রত্যাশার কাছে যেতে পারিনি। কারণ, গাড়ির আধিক্য, রাস্তার নানাবিধ সমস্যা ও আইন না মানার অপসংস্কৃতি। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডগুলো সম্পন্ন হলে আমাদের দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে। আমরা আইন প্রয়োগ করছি এবং করব কিন্তু এটি সমাধান নয়। সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে শত সমস্যার সমাধান ধীরে ধীরে হবে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে