মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৫:১৯ অপরাহ্ন

শুধু একজন মালেকই নয়, আরও মালেক কে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী?

শুধু একজন মালেকই নয়, আরও মালেক কে খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী?

বিশেষ সংবাদদাতা : গতকাল নিম্ন আদালতে অবৈধ অস্ত্র ও জালটাকার মামলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গাড়িচালক আব্দুল মালেককে সাতদিন করে ১৪ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়-এম খোকন সিকদার
সামান্য ড্রাইভার হয়ে চড়তেন সরকারি গাড়িতে। নিজের জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন ড্রাইভার। গড়েছেন শতকোটি টাকারও বেশি সম্পদ। রূপকথা নয় বলছি স্বাস্থ্যের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আবদুল মালেক ওরফে বাদলের কথা। দুর্নীতির টাকার অঙ্কে একই দপ্তরের আলোচিত হিসাব রক্ষক আফজালকে ছাপিয়ে গেছেন।

১৯৮২ সালে সাভার স্বাস্থ্য প্রকল্পে ড্রাইভার হিসেবে যোগ দেন। এর কয়েক বছর পর অধিদপ্তরের পরিবহন পুলে চাকরি শুরু করেন। অল্পদিনেই নিজের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।

অর্থের বিনিময়ে বিভিন্নজনের ভাগ্য পরিবর্তনে নেমে পড়েন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের শীর্ষ ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতায় নিয়োগ, বদলি, ঠিকাদারি সবকিছুতে প্রভাব বিস্তার করেন।

তৃতীয় শ্রেণির সামান্য ড্রাইভার হলেও তার ক্ষমতার কাছে নতিস্বীকার করতেন পেশাদার সৎ কর্মকর্তারা। তার কথার বাইরে গেলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নাস্তানাবুদ করে ছাড়তেন।

এর আগে তার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুইবার অনুসন্ধান করলেও অদৃশ্যবলে পার পেয়ে যায় মালেক। সর্বশেষ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অধিদপ্তরে কর্মরত ছিলেন। মাত্র এক মাস পর অবসর-পূর্ব ছুটিতে যাওয়ার কথা ছিলো। এর আগে র্যাবের জালে ধরা পড়েন।

মালেকের বিষয়ে তদন্তে নেমে রীতিমতো চোখ কপালে উঠেছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের। সন্দেহ ও বাড়তি নজরদারি এড়াতে ছিলেন সিদ্ধহস্ত। নিজেকে আড়াল করে পরিবারের সদস্যদের নামে গড়েছেন অঢেল সম্পদ। সরকারি তিনটি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন। পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মিও করতেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী এই প্রতিবেদককে বলেন, র্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তারের পূর্ব পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার কোনো উপায় ছিলো না।

ড্রাইভার মালেক ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশকারাতেই সব অপকর্ম করেছেন। যাদের মধ্যে কয়েকজন কর্মকর্তার নাম ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরেও এসেছে। তাদের বিষয়েও অনুসন্ধানে নেমেছে তারা।

গতকাল সোমবার আদালতে তোলা হলে অবৈধ অস্ত্র ও জালটাকা উদ্ধারের ঘটনায় করা পৃথক দুই মামলায় ১৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, একটি দপ্তরের সামান্য ড্রাইভার একা কোনোভাবেই এত অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়াতে পারে না। মালেক শুধু বাহক হিসেবে কাজ করেছে। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে হয়তো অনেক মহারথিদের নাম বেরিয়ে আসবে। তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব না হলে স্বাস্থ্যের এই বেহাল দশা কোনো।

মালেক ওই এলাকায় রীতিমতো মূর্তিমান আতঙ্ক। তুরাগ থানায় দক্ষিণপাড়া রমজান মার্কেটের উত্তর পাশে ছয় কাঠার ওপর সাত তলা (হাজি কমপ্লেক্স) আবাসিক ভবনে ২৪টি ফ্ল্যাট।

ওই বিল্ডিংয়ের পাশেই রয়েছে ১০ কাঠার একটি প্লট। প্রথম স্ত্রীর মেয়ে বেবির নামে রয়েছে দক্ষিণ কামারপাড়া ৭০ রাজাবাড়ী হোল্ডিংয়ে ১৫ কাঠা জায়গার ওপর ইমন ডেইরি ফার্ম নামে একটি বিশাল গরুর খামার।

কলাবাগানের হাতিরপুলে পৈতৃক সাড়ে ৪ কাঠা জমির ওপর ১০ তলা নির্মাণাধীন ভবন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্রাইভার্স অ্যাসোসিয়েশনের নামে একটি সংগঠন তৈরি করে সেই সংগঠনের সভাপতি হয়েছেন মালেক।

কেবল ড্রাইভারদের নিয়োগ-বদলি ও পদোন্নতির নামে হাতিয়েছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। এছাড়াও সরকারি পরিবহনের তেল চুরির সিন্ডিকেট পরিচালনাও করতেন।

আরও জানা যায়, ড্রাইভার আবদুল মালেক বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের জিম্মি করে ডাক্তারদের বদলি, পদোন্নতি, তৃতীয়,চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের নিয়োগের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করেছেন।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে মেয়ে নওরিন সুলতানাকে কম্পিউটার অপারেটর, ভাই আবদুল খালেককে অফিস সহায়ক, ভাতিজা আবদুল হাকিমকে অফিস সহায়ক, বড় মেয়ের স্বামী রতনকে ক্যান্টিন ম্যানেজার, আত্মীয় কামাল পাশাকে অফিস সহায়ক, ভায়রা মাহবুবকে ড্রাইভার এবং ভাগ্নে সোহেল শিকারীকে ড্রাইভার পদে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চাকরি দিয়েছেন তিনি।

বর্তমানে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. এ এইচ এম এনায়েত হোসেনের গাড়িচালক হিসেবে তিনি কর্মরত। তবে নিজে গাড়িচালক হয়েও মহাপরিচালকের পাজেরো গাড়িটি হরহামেশাই ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করতেন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, চারদিকের চিত্র আমাদের ইঙ্গিত করছে বড় কোনো সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছি। উচ্চপর্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সামান্য ড্রাইভার আবদুর মালেক শত কোটি টাকার দুর্নীতি করতে পারেনি। কিন্তু ইতোমধ্যে দেখেছি সবসময় কর্তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। এবার যেন সেটা না হয়।

কলামিস্ট, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ড্রাইভার আবদুল মালেকের ঘটনা সামগ্রিকভাবে দেশের অধপতন। প্রতিটি খাতে এমন আরও অনেকে রয়েছে।

দুর্নীতি আমাদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। ড্রাইভার থেকে সর্বোচ্চ পদধারী পর্যন্ত এই দুর্নীতি হচ্ছে। ড্রাইভার আবদুল মালেককে কর্তারা ব্যবহার করেছে। তাই আমার মনে হয় শুধু ড্রাইভারকে দোষ দিলে হবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার খুরশিদ আলমকে মুঠোফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে তিনি এক খুদে বার্তায় জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযুক্ত ড্রাইভার আবদুল মালেককে সরকারি চাকরি বিধি অনুসারে বরখাস্ত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এএইচএম এনায়েত হোসেন বলেন, আবদুল মালেক আমার ড্রাইভার ছিলো। কিন্তু তার দুর্নীতির ব্যাপারে কেউ অভিযোগ করেনি। অপরাধী হলে তার শাস্তি পেতে হবে। এর আগে সে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেকজন ডিজির গাড়ি চালিয়েছিল।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মান্নান বলেন, শুধু একজন মালেকই নয়, আরও অনেক মালেক হয়তো এখানে আছে। কাউকে ছাড় দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না, ছাড় পাওয়ার সুযোগ নাই। আমরা তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছি।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest