বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৮:৫৭ অপরাহ্ন

দুর্নীতি করে ধরা পড়লে কেউ রেহাই পাবে না – বিসিকের চেয়ারম্যান

দুর্নীতি করে ধরা পড়লে কেউ রেহাই পাবে না – বিসিকের চেয়ারম্যান

বিশেষ প্রতিনিধি :  বিসিকের চেয়ারম্যান  হিসেবে দায়িত্ব নিয়েই অতিরিক্ত সচিব মো. মোশতাক হাসান বিভিন্ন শিল্পনগরী ঘুরে বেড়াচ্ছেন। জানছেন, কোথাও কোনো সমস্যা আছে কি-না। চেষ্টা বিসিককে স্মরণীয় করতে নতুন করার। এ জন্য ক্ষুদ্রশিল্পের গণ্ডি ছাড়িয়ে বড় শিল্পের দিকে নজর দিয়েছেন।

অল্প সময়ে বিসিককে মনে রাখার ইতিহাসও সৃষ্টি করেছেন। দুর্নীতি সবকিছু ম্লান করায় জেহাদ ঘোষণা করেছেন। বলেছেন, দুর্নীতি করে ধরা পড়লে কেউ রেহাই পাবে না। সম্প্রতি বিসিক ভবনে আমার সংবাদকে একান্ত সাক্ষাতে এভাবেই এগিয়ে যাওয়ার কথা জানান।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশনের (বিসিক) কার্যক্রম দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বের দরবারে স্থান করে নিয়েছে। বর্তমানে প্রায় আট লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এ প্রতিষ্ঠানে। ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বিসিকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেন অতিরিক্ত সচিব মো. মোশতাক হাসান, এনডিসি।

৩১ বছরের চাকরিজীবনে তিনি সহকারী কমিশনার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিসিকে যোগদানের আগে তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই সব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্বপ্ন দেখেছেন ব্যতিক্রম কিছু করার, যাতে সবাই বিসিককে চিনে। করোনা ভাইরাসে দেশ স্থবির হয়ে গেলেও তার ধকল সামলাতে প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা করা প্যাকেজে সেই স্বপ্নে সফল হয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, ২০ হাজার কোটি টাকার শিল্প ঋণ প্রণোদনা প্যাকেজ বিসিকের উদ্যোক্তাদের বিতরণের জন্যই ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটা বিসিকের ইতিহাসে রেকর্ড। উদ্যোক্তারা কেয়ামত পর্যন্ত মনে রাখবে। এই ঋণ বিতরণ ব্যবস্থায় গতি বাড়াতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অনুমোদনের পর প্রতি জেলার জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক করে গত ১ জুন ১১ সদস্যের ‘জেলা এসএমই ঋণ বিতরণ মনিটরিং কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।

কমিটিতে জেলা চেম্বার সভাপতি, ব্যাংকের জেলাপর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তা, নাসিবের জেলা সভাপতি, উইমেন চেম্বার সভাপতি এবং জেলা প্রশাসক মনোনীত স্থানীয় গণ্যমান্য একজন ব্যক্তিও রাখা হয়েছে। আর সদস্য সচিব করা হয়েছে বিসিকের শিল্প সহায়ক কেন্দ্রের ডিজিএম বা ম্যানেজারকে।

একই সাথে এসএমই ঋণ বিতরণে সহাযোগিতা করতে কমিটির কার্যপরিধিও নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও কুটির এবং মাঝারি শিল্পের ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তারা যাতে স্বচ্ছতার সাথে ঝামেলাহীনভাবে ব্যাংক থেকে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ঋণ গ্রহণ করতে পারে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ঋণ গ্রহিতা নির্বাচন, ঋণ বিতরণ ও তদারকি এবং আদায় কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রাপ্ত সমস্যা স্থানীয়ভাবে সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণও করতে বলা হয়েছে। কমিটিকে ঋণ বিতরণ কার্যক্রম চলাকালীন প্রতি মাসে কমপক্ষে একবার সভা করতে হবে। সভার সিদ্ধান্ত ও ঋণ বিতরণ কার্যক্রমের মাসিক অগ্রগতি শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অবহিত করতে হবে। এসএমই উদ্যোক্তাদের স্বার্থে এই ধরনের উদ্যোগ কখনো বাংলাদেশে নেয়া হয়নি। যা কিয়ামত পর্যন্ত রেকর্ড হয়ে থাকবে।

বিসিএসের ১৯৮৬ ব্যাচের এই শীর্ষ নির্বাহী বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন শর্ত জুড়ে দিলে উদ্যোক্তাদের স্বার্থে শিথিল করতে ১৭টি সুপারিশ করা হয়েছে বিসিকের পক্ষ থেকে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে— ব্যাংক হিসাব নম্বর, অডিট রিপোর্ট, মর্টগেজ।

তিনি বলেন, অনেক উদ্যোক্তা নিজস্ব অর্থে ব্যবসা করেন। তারা ব্যাংক লেনদেন করেন না। তাহলে কি ঋণ পাবে না। ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অডিট হয় না। অনেক ভালো উদ্যোক্তা হলেও জমি থাকে না। অনেকের পারিবারিক সমস্যা থাকে জমির কাগজপত্র দিতে। তাই গ্রুপের নিজেদের মধ্যে জামিনদার রেখে ঋণ দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংককে। বিসিক বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়ায় এই প্যাকেজের দুই হাজার ৮০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। চার হাজার কোটি টাকা অনুমোদন পেয়েছে।

অল্প সময়ের মধ্যে তা বিতরণ করা হবে উদ্যোক্তাদের মধ্যে। এই ঋণ বিতরণ করা হলে লাখ লাখ উদ্যোক্তার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এখান থেকে প্রাণ আরএফএল, বিআরবি ক্যাবলের মতো বড় বড় উদ্যোক্তা হবে। সুনাম ছড়াবে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বে। কারণ এই বিসিকের ৩২ জন উদ্যোক্তা রাষ্ট্রের স্বীকৃতপ্রাপ্ত সিআইপির মর্যাদা লাভ করেছেন।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে সরকার বিব্রত। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অতিরিক্ত সচিব বলেন, বিসিকের দুর্নীতির ব্যাপারে জেহাদ ঘোষণা করা হয়েছে। ধরা পড়লে কেউ রেহাই পাবে না। বিভিন্ন কারণে এ প্রতিষ্ঠানে দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। বর্তমানে ১৩৯টি মামলা চলমান রয়েছে। তিনি বলেন, বিসিক হবে পরিচ্ছন্ন প্রতিষ্ঠান। তাই বয়স্করা অবসরে গেলে ভালো লোক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। আশা করি নতুন করে কেউ অনিয়ম করতে পারবে না।

ময়মনসিংহের এই কৃতিসন্তান বলেন, এক সময়ে অনেকেই বিসিককে চিনতো না। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্নভাবে উদ্যোগ নিয়ে বড় ঋণ দেয়ারও উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যাতে লাখ লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে প্রাণ, বিআরবির মতো বড় বড় উদ্যোক্তা হয়ে যায়। এটাই বড় সফলতা। বিসিক আইন হয়েছে। বর্তমানে সবাই চেনে। বর্তমানে বিসিক শিল্পনগরীর সংখ্যা হচ্ছে ৭৯টি। জমির পরিমাণ দুই হাজার ৪৩ একর বা ছয় হাজার ১২৯ বিঘা। শিল্প প্লটের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ১১ হাজার। বরাদ্দকৃত প্লট ১০ হাজার ৩৭৯টি। খালি প্লট রয়েছে ৫৪৩টি।

তিনি বলেন, করোনা ভাইরাসে বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও সব কিছু থমকে যায়। কিন্তু বিসিকের উৎপাদন সমানে চলেছে। সুরক্ষাসামগ্রী থেকে শুরু করে খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন একদিনও বন্ধ থাকেনি। বর্তমানে উৎপাদনরত শিল্প ইউনিটের সংখ্যা হচ্ছে চার হাজার ৫৭০টি। মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হচ্ছে ৬৩ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা। আর উৎপাদিত পণ্যের মূল্য দুই লাখ ১৭ হাজার ২৬৩ কোটি টাকা। বিসিকের পণ্য শুধু দেশের মানুষের চাহিদায় সীমাবদ্ধ নেই। ৮৭০টি শিল্প ইউনিটের মাধ্যমে বিশ্বে ৫২ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকার পণ্যও রপ্তানি করা হয়েছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন প্রকল্পের কিছু কিছু ব্যয় নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। বিসিকের অসংখ্য প্রকল্প চলামান। সাভারে ২০০ একর জমিতে ট্যানারি পণ্যশিল্পসহ রাজশাহী এবং চট্টগ্রামেও ট্যানারি শিল্প নগরী তৈরি করা হচ্ছে।

ব্যয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে দীর্ঘদিন থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন পদে কাজ করা এই অভিজ্ঞ প্রশাসক বলেন, বিসিকের কোনো অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করা হয় না। যা দরকার তাই ব্যয় করা হয়। প্রকল্পের ব্যয়ের ব্যাপারে তীক্ষ্ন নজর রাখা হয়েছে। করোনায় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে ধাক্কা লাগলেও শত ভাগে বিসিক দ্বিতীয় অবস্থান করেছে। চলতি অর্থবছরে এডিপিতে দেড় হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। পাওয়া গেছে ৫০০ কোটি টাকা। বিসিকের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। তাই আরও অর্থ চাওয়া হবে এ বছরের জন্য।

বিসিকের সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমানে আমরা নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিল্ডিংও নির্মাণ করি। সরকারের ভিশন-২০৪১ সামনে রেখে উন্নত বাংলাদেশ গড়তে বিসিক ১০০টি শিল্পপার্ক স্থাপনের মাধ্যমে দুই কোটি লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শুরু করেছে। এ জন্য ৪০ হাজার একর বা ১২০ হাজার বিঘা জমি লাগবে।

উদ্দেশ্য একটাই, উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে সামিল হওয়া। এ জন্য যা যা করা দরকার তাই করা হবে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই ১০টি লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পনগরী করা হবে। ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প দিয়ে বিসিকের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে বড় শিল্পের দিকে ঝুঁকছে বিসিক। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

একই সাথে বিসিকের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দক্ষ করে গড়ে তুলতে বিসিক ভবন, আধুনিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে পূর্বাচলে ৫ একর বা ১৫ বিঘা জমি চাওয়া হয়েছে রাজউকের কাছে। আশা করি এ জমি পাওয়া গেলে পাল্টে যাবে বিসিকের চেহারা।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest