মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর ২০২০, ০৯:৪২ অপরাহ্ন

স্বাস্থ্যের লুটপাটে ৬০ মুঘল চিহ্নিত

স্বাস্থ্যের লুটপাটে ৬০ মুঘল চিহ্নিত

খায়রুল আলম রফিক :
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশ করেছিল গত বছর। অথচ সুপারিশ অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি; যার ফলে কথিত মুঘলদের দাপটে স্বাস্থ্য খাতে লুটপাট। অবশেষে মাঠে নেমেছে দুদক স্বয়ং।
ড্রাইভার মালেকের পর আরো ৬০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন দুদকের নজরদারিতে। এদের পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসবাদ করা হবে বলে দুদক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।
গত বছর দুদক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১১টি খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম খুঁজে পায়। এর মধ্যে বেশি দুর্নীতি হয় কেনাকাটা, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার এবং ওষুধ সরবরাহ খাতে। ‘সাদা চোখে দেখা’ দুর্নীতির বাইরে একটি অভিনব দুর্নীতির কথাও তখন জানিয়েছিল দুদক। সেটি হলো অর্থ আত্মসাতের জন্য অনেক অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা। এমন যন্ত্রপাতি কেনা হয়, যা পরিচালনার জনবল নেই। এগুলো কখনই ব্যবহার করা হয় না। দুদক তখন দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশ করে বলে, দুর্নীতির কারণেই স্বাস্থ্য খাতের করুণ অবস্থা। গত বছরের ২ ফেব্রুয়ারি সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদনটি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের হাতে তুলে দেন দুদকের কমিশনার (অনুসন্ধান) মোজাম্মেল হক খান। দুদকের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক দল পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনটি তৈরি করে। দুদক কমিশনার মোজাম্মেল হক খান তখন সাংবাদিকদের বলেন, এ প্রতিবেদনের আলোকে মন্ত্রণালয় যদি ব্যবস্থা নেয় তা হলে দুর্নীতি প্রতিরোধে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরি হবে।
দুদক স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন দিয়ে যে ২৫ দফা সুপারিশ করেছিল তা দুর্নীতির কারণে এতদিন আড়াল হয়েছিল। তবে সম্প্রতি নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের ৪৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও চিহ্নিত করে দুদক। এ ছাড়া মাস্ক ও পিপিই কেনায় দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) ১৫ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুদকের নজরদারিতে রয়েছেন। সব মিলিয়ে নজরদারিতে রয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের ৬০ জনেরও বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী।
এদিকে একের পর এক অভিযোগে বিদ্ধ হওয়া স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির লাগাম টানতে এবার জোরেশোরেই মাঠে নেমেছে দুদক। একাধিক টিম মাঠে নেমে স্বাস্থ্য খাতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে সীমাহীন দুর্নীতির তথ্য পাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্রাইভার আবদুল মালেকের মতো আরো অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি করে বাড়ি-গাড়ি ও বিপুল বিত্তের মালিক বনে যাওয়ার তথ্য পাচ্ছেন দুদকের গোয়েন্দারা। নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য, ঘুষ-দুর্নীতি, নিয়ম ভেঙে ঠিকাদারি ব্যবসায় জড়ানোসহ নানা অবৈধ উপায়ে কোটি কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তারা। অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের ৪৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ২১ জন এবং তাদের স্ত্রী-সন্তানসহ ৪৩ জনের সম্পদের হিসাব চেয়েছে দুদক। বাকিদেরও হিসাব বিবরণী তলবের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানান, দুদকের নজরে রয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের ৬০ জনের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী। যাদের পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদে যাদের নাম আসবে তাদেরও নজরদারিতে এনে অনুসন্ধান করা হবে।
দুদকের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অফিস সহকারীসহ ২৮ ‘কোটিপতি’র তথ্য তুলে ধরা হয়। তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের (বর্তমানে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক) গাড়িচালক আবদুল মালেক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান সহকারী সৈয়দ জালাল, জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার, জাকির হোসেন, ক্যাশিয়ার আতিকুল ইসলাম, প্রশাসনিক কর্মকর্তা কবির আহমেদ চৌধুরী, অফিস সহকারী ইকবাল হোসেন, এইডস শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা জালাল উদ্দিন, স্টোনোগ্রাফার শাহজাহান ফকির, এমআইএস শাখার প্রোগ্রামার রুহুল আমিন, স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যুরোর ট্রেনিং অ্যান্ড ফিল্ড অফিসার আমিনুল ইসলাম এবং স্বাস্থ্যশিক্ষা ব্যুরোর হেলথ এডুকেটর জাকির হোসেন। এ ছাড়া ঢাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইপিআই ভবনের অফিস সহকারী তোফায়েল আহমেদ, কমিউনিটি ক্লিনিক শাখার উচ্চমান সহকারী আনোয়ার হোসেন, নিকেতনের ফাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রকল্পের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল্লাহ হেল কাফী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ সচিব আনোয়ার হোসেন, জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহামুদুজ্জামান, স্টোর কর্মকর্তা দোলোয়ার হোসেন। খুলনার শেখ আবু নাসের হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা ওয়াহিদুজ্জামান, সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসের প্রধান সহকারী আশিক নেওয়াজ, ফরিদপুর সিভিল সার্জন অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জালাল মোল্লাহ, গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্টোর অফিসার নাজিম উদ্দিন, বিভাগীয় পরিচালক (রাজশাহী) অফিসের প্রধান সহকারী হেলাল উদ্দিন, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের স্টোরকিপার সাফায়াত হোসেন ফয়েজ, বিভাগীয় পরিচালক (খুলনা) অফিসের স্টোনোগ্রাফার ফরিদ উদ্দিন ও প্রধান সহকারী মাহাকাব হোসেন এবং বিভাগীয় পরিচালক (ঢাকা) অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা দিপক কান্তি।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest