শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০২০, ০২:০৯ অপরাহ্ন

রাজনীতির সুসময়ে কেন বিতর্কিতরা!

রাজনীতির সুসময়ে কেন বিতর্কিতরা!

রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের সুসময়। মাঠ কিংবা ভোটের রাজনীতিতে একের পর এক সফলতায় উজ্জীবিত ক্ষমতাসীন দলটির কর্মী-সমর্থকরা। তাদের দাপটে মাঠের আন্দোলন সংগ্রামে শক্তিশালী বিরোধী দলের অস্তিত্ব দৃশ্যত অনুপস্থিত।

অথচ রাজনীতির এই সুসময়েও বিতর্কমুক্ত নেতৃত্ব গঠনে ব্যর্থ ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতাসীন দলটি সহযোগী সংগঠনের দায়িত্বশীল নেতারা।

দলের হাই-কমান্ডের নির্দেশ উপেক্ষা করে নবঘোষিত কমিটিতে মাদককারবারি, রাজাকারপুত্র, জামায়াত-শিবির সমর্থক এবং নানামুখি বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্তদের স্থান দিয়েছেন। একই সাথে স্থান পেয়েছেন দুই সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলররা। অথচ কাউন্সিলরদের না রাখতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে বঙ্গবন্ধুকন্যার সেই নির্দেশনার তোয়াক্কা করেনি মহানগরের দায়িত্বশীল নেতারা।

দলীয় সূত্র, গত ১৪ নভেম্বর ঘোষণা করা হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী সংগঠন যুবলীগের কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি। ক্যাসিনোকাণ্ডে লণ্ডভণ্ড হওয়া যুবলীগকে বিতর্কমুক্ত করতে অনেকটাই চ্যালেঞ্জ ছিলো সংগঠনের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের।

দীর্ঘ এক বছরের প্রচেষ্টায় ছাত্রলীগের একঝাঁক সাবেক নেতাদের সমন্বয়ে ২০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করেন তারা। তবুও বিতর্ক পিছু ছাড়েনি তাদের। ঘোষিত কমিটিতে স্থান পেয়েছেন বেশ কয়েকজন বিতর্কিত নেতা। এদের মধ্যে সব থেকে বেশি সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে চৌধুরী মৌসুমী ফাতেমাকে (কবিতা) নিয়ে। তিনি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সমালোচনার ঝড়।

অনেকে তার সাথে বিএনপির চেয়ারপারসনের ছবি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, মৌসুমী তুমি কার? যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য পদ পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিপরীক্ষায় জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আজীবন বহিষ্কার হওয়া সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মো. মহিউদ্দিন রানা।

কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের তালিকায় ১৮৬ নম্বরে মহিউদ্দিন রানার নাম রয়েছে। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘ ইউনিটের ভর্তিপরীক্ষার আগের রাতে (১৯ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হল থেকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র মহিউদ্দিন রানাসহ ছাত্রলীগের দুই নেতাকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

কমিটিতে স্থান পেয়েছেন মোয়াজ্জেম হোসেন, ডা. আওরঙ্গজেব, নাজমুল হোসেন জুয়েল, নূরে আলমসহ আরও অনেককে নিয়েও রয়েছে মুখরোচক আলোচনা। কমিটিতে বিএনপিসহ ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের পরিবার থেকেও হয়েছে পদায়ন। একঝাঁক সাবেক ছাত্রনেতা স্থান পেলেও পদায়নে মানা হয়নি সিনিয়র-জুনিয়র। আওয়ামী লীগের জেলা, উপজেলার শীর্ষ পদে আছেন, এমন লোকও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য থেকে শুরু করে ইসি ও সিসির সদস্য হয়েছেন।

বাদ যায়নি নানা অভিযোগে ছাত্রলীগ থেকে বাদ পড়া বিতর্কিতরাও। এ ছাড়া স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠেছে। আগের কমিটি যাদের মনোনীত করে তৎকালীন নেতৃত্ব বিতর্কিত হয়েছিলেন, সেই সব ‘মনোনীত’ নেতারাও কৌশলে এবার পদোন্নতি নিয়েছেন। বিতর্কে পিছিয়ে নেই আওয়ামী সেচ্ছাসেবক লীগের নবঘোষিত কমিটিও।

আওয়ামী লীগের অন্যতম এই সহযোগী সংগঠনে স্থান পেয়েছেন বেশ ক’জন বিতর্কিত নেতা। এর মধ্যে অবৈধ ক্যাসিনোকাণ্ডে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্তত থাকা মোল্লা কাওসারের ‘ক্যাশিয়ার’ বলে পরিচিত কাজী শহীদুল্লাহ লিটন। তিনি স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদ্য ঘোষিত কমিটির ৫ নম্বর সহ-সভাপতি দায়িত্ব পেয়েছেন।

নতুন কমিটিতে সহ-সভাপতি হিসেবে ঠাঁই পেয়েছেন দেবাশীষ বিশ্বাস ও অ্যাডভোকেট মানিক ঘোষ। এঁদের একজনের বিরুদ্ধে রাজধানীজুড়ে টেন্ডারবাজি, অন্যজনের বিরুদ্ধে ক্যাসিনো কারবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন মোবাশ্বের চৌধুরী।

তার বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি ছাড়াও ক্যাসিনো কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। উপদেষ্টা সদস্য সৈয়দ নুরুল ইসলাম, পাট ও বস্ত্র বিষয়ক সম্পাদক আশীষ কুমার সিংহ, উপ-পাট ও বস্ত্র বিষয়ক সম্পাদক তারেক মাহমুদ চৌধুরী পাপ্পু, সদস্য জাবেদ মাসুদ, বোখারি আজম, উপ-প্রতিবন্ধী উন্নয়ন-বিষয়ক সম্পাদক ডা. উম্মে সালাম মুনমুন ও মো. আজগর আলী।

এছাড়া কার্যনির্বাহী সদস্য হয়েছেন সাইফুল্লাহ আনসারী। এদের বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত সাথের রাজনীতি, অপহরণ মামলার আসমিসহ নানামুখি অপরাধের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। একই অবস্থা কৃষক লীগের। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম স্মৃতির সঙ্গে ভালো সম্পার্ক থাকায় পদ পেয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে আওয়ামী-বিরোধী পরিবার হিসেবে পরিচিত পরিবারের সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জহিরউদ্দিন লিমন।

তিনি কৃষক লীগের আইন সম্পাদক পদ পেয়েছেন। লিমনের বাবা রেলওয়ের সাবেক কর্মচারী মৃত ইসহাক মিয়া এবং শ্বশুর মাওলানা আবদুস শহীদ এলাকায় জামায়াত ঘরানার লোক হিসেবে পরিচিত। কৃষক লীগের কমিটিতে আবদুর রাশেদ খানকে পানি, সেচ ও বিদ্যুৎ বিষয়ক সম্পাদকের পদ দেয়া হয়েছে।

রাশেদ খান সরাসরি জামায়াতের সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। ২০০৬ সালে গোপালগঞ্জে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবদুস সাত্তার ফরাজীর সঙ্গে একই মঞ্চে বসে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া কখনো আওয়ামী লীগ বা কৃষক লীগ না করেও তথ্য এবং গবেষণা বিষয়ক সম্পাদকের পদ পেয়েছেন শামীমা সুলতানা। তিনি নড়াইলের প্রয়াত বিএনপি নেতা শরীফ খসরুজ্জামানের মেয়ে।

শরীফ খসরুজ্জামান একসময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ২০০৮ সালে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে পরাজিত হন। শামীমা সুলতানার আপন ভাই শরীফ কাসাফুজ্জামান সর্বশেষ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পান।

তবে জোটের শরিক প্রার্থীর কাছে বিএনপি আসনটি ছেড়ে দিলে শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচন করতে পারেননি। কৃষক লীগের কমিটিতে হিজবুল বাহার রানার সাংগঠনিক সম্পাদক পদ পাওয়া নিয়েও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। রেজা মাদক মামলার আসামি। ২০১১ সালে চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবা আনার অভিযোগে র্যাব কুমিল্লায় তাকে গ্রেপ্তার করে।

সম্মেলনের প্রায় এক বছর গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হয়েছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ থাকার পরেও কমিটিতে তিন জন সংরক্ষিতসহ ১১ জন কাউন্সিলরকে বিভিন্ন পদে রাখা হয়েছে।

একই সাথে স্থান পেয়েছে বর্তমান দেশের সব থেকে আলোচিত সংসদ সদস্য হাজী সেলিম। তাকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হয়েছে।

এছাড়া ক্যাসিনো কাণ্ডে অভিযুক্ত সহ বেশ কিছু নেতা দায়িত্বশীল পদপদবি বাগিয়ে নিয়েছেন, যারা কখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন না। বিতর্কিতরা স্থান পেয়েছেন মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে। ফলে বাদ পড়েছেন দুর্দিনের ত্যাগী, মেধাবী, আদর্শিক ও মাঠের আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় থাকা নেতারা।

এর আগে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে বিএনপি-জামায়াত পরিবারের সন্তানকে স্থান দেয়া হয়। যদিও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের চাপে প্রায় ৩৩ জনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবুও আরও বিতর্কিতরা সংগঠনের দায়িত্ব পালন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দীন নাছিম আমার সংবাদকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে বিতর্কমুক্ত করতে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। দলের মধ্যে কোনো ধরনের বিতর্কিত স্থান দেয়া হবে না। এ বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে আছেন, বিতর্ক সৃষ্টি করার জন্যই বিরোধিতা করেন। কোনো কিছু সঠিক না জেনে অন্যের কাছে সমালোচনা করেন। সঠিক তথ্য যাচাই-বাছাই না করে সমালোচনা করা ঠিক নয়। রাজনৈতিক সহ সকল শ্রেণির মানুষের এ ধরনের চিন্তা-চেতনা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। অল্পতে কোনো কিছুর সমালোচনা করা ঠিক নয়।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘আওয়ামী লীগের একটি বড় রাজনৈতিক দল। এই দলের একটি পদের জন্য একাধিক যোগ্য নেতা রয়েছেন। কিন্তু সবাইকে তো আর পদে নিয়ে আশা সম্ভব নয়। অনেকেই না পাওয়ার আক্ষেপ থেকে সমালোচনা করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কোনো বিতর্কিতদের স্থান দেয়া হবে না। যাদের নিয়ে বিতর্কসৃষ্টি হয়েছে। তাদের বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest