শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:৩২ অপরাহ্ন

ধর্ষণকাণ্ডে মেতে উঠছে ছাত্রলীগ নামধারীরা

ধর্ষণকাণ্ডে মেতে উঠছে ছাত্রলীগ নামধারীরা

বিশেষ সংবাদদাতা :
এতটাই বেপরোয়াপনায় মেতেছে ছাত্রলীগ, যারা আজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘুরতে আসা অন্যের স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ হয়ে করছে গণধর্ষণ। পাহাড়ে কিংবা সমতলের কোথাও যখন নিরাপদ নয় নারীরা, তখনই ধর্ষণকাণ্ডে মেতে উঠছে ছাত্রলীগ নামধারীরা।

এসব কথা প্রতিবেদকের নয়, বলছেন দেশের সাধারণ মানুষ। প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সিলেটের এমসি কলেজে ঘটে যাওয়া গণধর্ষণের ঘটনার পর এমন আলোচনাই এখন টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।

অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, দুটি ল্যান্স থেকেই বিষয়টিকে দেখা যেতে পারে। তার একটি হচ্ছে— ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ বা তাদের রাজনীতির বিরুদ্ধে যাদের অবস্থান তারা হয়তো ঢালাওভাবে তাদের বিরুদ্ধে কথা বলবে।

কিন্তু অপরাধ বিজ্ঞানীরা তাদের বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে কথা না বলে তারা বলছেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে না পারা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকশিত না হওয়া এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যে গণতন্ত্রায়ণ প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার কারণে যে দলই ক্ষমতায় যাচ্ছে তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে বেপরোয়াপনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সিলেটের এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কর্মী দ্বারা দুর্ভাগ্যজনকভাবে যে নৃশংস ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে সেটি আসলে তারই প্রতিফলন— বলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক, অপরাধ বিজ্ঞানী ড. জিয়া রহমান। যে ঘটনার নিন্দা জানানোর ভাষা জানা নেই তার।

এরকম ঘটনায় গণমাধ্যমে লেখালেখি কিংবা আমরা যেসব কথা বলছি তাতে হয়তো এসব ঘটনা থেকে উতরাতে সাহায্য করবে কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতর অবস্থান ছাড়া এ ধরনের ঘটনা কখনোই দূর হবে না বলে বলছেন তিনি।

তিনি বলেন, প্রথমত যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দ্রুততার সাথে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। রাজীব হত্যা, রাকিব হত্যা, খাদিজার ঘটনায় দ্রুততার সাথে বিচার আমরা দেখেছি। তিনি মনে করেন, এটা হচ্ছে একটা অংশ।

আরেকটা অংশ হচ্ছে, যদি আমরা এসব ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চাই তাহলে যদি সংস্কৃতির পরিবর্তন না করতে পারি এবং ক্ষমতায় আঁচড়ে পড়ে মানুষ যেভাবে দলের মধ্যে ঢুকে যায়, যাদের যোগ্যতা নেই, এসব লোকরা যদি নেতা হয়ে যায় এবং তাদের যদি পেট্রোনাইজড করা হয়, যারা নেতা তাদেরও যদি পেট্রোনাইজড করা হয় তাহলে কিন্তু যত শাস্তির ব্যবস্থাই করি না কেন তাতেও কিন্তু সমাধান হবে না।

অপরাধ বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি মনে করেন, যেকোনো ছাত্র সংগঠনই দল ক্ষমতায় আসার পর তাদের যে বেপরোয়া চরিত্র সেটা বন্ধ হওয়া খুবই জরুরি। আর রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সবকটি বিষয়ে যদি দলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সচেষ্ট হয় তবেই কিন্তু এদের বেপরোয়াপনা বন্ধ হবে বলে মনে করছেন তিনি।

শুক্রবার রাতে এমসি কলেজে ঘুরতে গিয়ে প্রধান ফটকের সামনে নিজেদের গাড়িতে বসে গল্প করছিলেন স্বামী-স্ত্রী। একপর্যায়ে রাত ৮টার দিকে তরুণীর স্বামী সিগারেট খাওয়ার জন্য এমসি কলেজের গেটের বাইরে বের হন। এসময় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী তরুণীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যেতে চায়।

এতে তরুণীর স্বামী প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর শুরু করেন ছাত্রলীগের কর্মীরা। একপর্যায়ে ওই তরুণী ও তার স্বামীকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এমসি কলেজের হোস্টেলে নিয়ে যান। সেখানে স্বামীকে বেঁধে তিন-চারজন তরুণীকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এসময় তাদের সাথে থাকা ৯০টি মডেলের একটি কারও ছিনিয়ে নিয়ে যান ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।

সিলেট নগরীর টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের ২০১২ সাল থেকে ছাত্রলীগের দখলে থাকা কক্ষ হিসেবে পরিচিত একটি কক্ষের সামনে গণধর্ষণের এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে মহানগর পুলিশের শাহপরান থানার একদল পুলিশ সেখানে গিয়ে স্বামী-স্ত্রীকে উদ্ধার করে।

এসময় অভিযুক্ত ধর্ষকদের ব্যবহূত একটি মোটরসাইকেল ফেলে যাওয়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। আর ওই দম্পতির ব্যবহত ব্যক্তিগত গাড়িটিও উদ্ধার করা হয়েছে। সিলেট মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মোহা. সোহেল রেজা বলেন, স্বামীকে আটকে রেখে কয়েকজন যুবক তার স্ত্রীকে তুলে নিয়ে ছাত্রাবাসের নির্জন স্থানে ধর্ষণ করেছেন। ধর্ষণকারীদের শনাক্ত করে আটক করতে পুলিশি অভিযান চলছে। যদিও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের অনেকেই এখনো ফেসবুকে সরব থাকলেও তাদের গ্রেপ্তারে সমর্থ হয়নি পুলিশ।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) জ্যোতির্ময় সরকার বলেন, শুক্রবার রাত ৩টা থেকে ছাত্রাবাসসহ আশপাশের এলাকায় অভিযান হয়েছে। ধর্ষণকারী শনাক্ত ও গ্রেপ্তার বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।

তিনি জানান, ওই তরুণীকে রাত ১২টার দিকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে (ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার) ভর্তি করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা মোটরসাইকেলটির মালিকের সূত্র ধরে ধর্ষণকারী শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। ছাত্রাবাসে নিয়মিত যাতায়াতকারী ছয়জন সম্পর্কে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। এই ছয়জনের বাড়ি হবিগঞ্জ, সিলেট, সুনামগঞ্জের দিরাই ও জগন্নাথপুরে। তারা এমসি কলেজের সাবেক ছাত্র ও ছাত্রলীগকর্মী।

পুলিশ বলছে, ওই তরুণীর (২০) বাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমায়। স্বামীর সঙ্গে নিজেদের গাড়িতে করে শুক্রবার বিকালে এমসি কলেজ এলাকায় বেড়াতে যান। গাড়িটি চালাচ্ছিলেন তার স্বামী। সন্ধ্যার পর কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়িটি রেখে একটি দোকান থেকে তারা কেনাকাটা করেন।

পরে ফিরে গাড়িতে বসে গল্প করছিলেন তারা। রাত ৮টার দিকে পাঁচজন যুবক তাদের গাড়িটি ঘিরে ধরে স্বামী ও স্ত্রীকে জোর করে গাড়ি থেকে নামান। তিনজন যুবক তরুণীকে টেনে ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের একটি কক্ষের সামনে নিয়ে যান। স্বামীকে তখন গাড়িতে আটকে রেখেছিলেন দুজন যুবক। ঘণ্টাখানেক পর তাকে ছেড়ে দেয়া হলে তিনি এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের একটি কক্ষের সামনে গিয়ে স্ত্রীকে বিধ্বস্ত অবস্থায় দেখতে পান।

জানা গেছে, ২০১২ সালের ৮ জুলাই ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষের জের ধরে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়েছিল ছাত্রাবাসের ৪২টি কক্ষ। ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর পুনর্নিমিত ছাত্রাবাস উদ্বোধন করা হয়। এরপর থেকে ছাত্রলীগই এককভাবে ছাত্রাবাসে আবাসিক ছাত্রদের বসবাস নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কোনো কমিটি নেই।

তরুণীর স্বামী পুলিশকে বলেছেন, যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছেন তারা সংখ্যায় পাঁচ থেকে ছয়জন ছিলেন। এর মধ্যে দুজনকে তিনি এমসি কলেজ ও ছাত্রাবাসে আগে দেখেছেন। এই দুজন তাকে নিজের গাড়িতে আটকে রেখেছিলেন। তিন থেকে চারজন তার সামনে স্ত্রীকে টেনে ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকে নিয়ে যান। ঘণ্টাখানেক পর ওই তিন যুবক দৌড়ে চলে যাওয়ার সময় তাকে জিম্মি করে রাখা দুই যুবকও পালিয়ে যান।

এমসি কলেজের অধ্যক্ষ সালেহ আহমদ বলেন, রাতে শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নেতৃত্বে একদল পুলিশ ছাত্রাবাসে প্রবেশের অনুমতি চায়। আমি তখন ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কসহ স্টাফ কোয়ার্টারে বসবাসরত দুজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে পুলিশকে ছাত্রাবাস এলাকায় প্রবেশ করার অনুমতি দিই। কিছুক্ষণ পর জানানো হয়, সেখানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

এ খবর পেয়ে আমি অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব-৯) একটি দলকেও খবর দিই। পুলিশের সঙ্গে রেবের একটি দল তদন্ত করছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে ছাত্রাবাস বন্ধ। শুনেছি নেতারা (ছাত্রলীগ নেতা) সেখানে ছিলো। এর বাইরে আর কিছু আমি জানি না। এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করে শাস্তির আওতায় আনতে পুলিশ ও র্যাবকে বলেছি।

১৮৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত এমসি কলেজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নগরের টিলাগড় এলাকায় ৬০০ শতক জায়গার ওপর ১৯২০ সালে ব্রিটিশ আমলে আসাম ঘরানার স্থাপত্যরীতির ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়েছিল। ২০১২ সালের ৮ জুলাই ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষের জের ধরে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয়েছিল ছাত্রাবাসের ৪২টি কক্ষ।

২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর পুনর্নিরমত ছাত্রাবাস উদ্বোধন করা হয়। এরপর থেকে ছাত্রলীগই এককভাবে ছাত্রাবাসে আবাসিক ছাত্রদের বসবাস নিয়ন্ত্রণ করছে। যদিও এমসি কলেজে ছাত্রলীগের কোনো কমিটি নেই। সিলেটে জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগের কমিটিও কেন্দ্র থেকে স্থগিত রয়েছে। ছাত্রাবাসে ছাত্রলীগের কক্ষের সামনে ধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রলীগের দায়িত্বশীল কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এমসি কলেজ ও সিলেট মহানগর ছাত্রলীগের একাধিক নেতা বলেন, ছাত্রাবাসে অগ্নিসংযোগের যে ঘটনা ঘটেছিল, সেই ঘটনার পর থেকে ৭ নম্বর ব্লকের কক্ষটি ‘ছাত্রলীগের’ হিসেবে পরিচিত। ২০১৪ সালের ১৪ অক্টোবর ছাত্রাবাস খোলার পর থেকে ওই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ছাত্রলীগের একাধিক পক্ষের সৃষ্টি হয়।

২০১৭ সালের ১৩ জুলাই ছাত্রলীগের দুই পক্ষে আধিপত্য বিস্তারে ছাত্রাবাসে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। তখন প্রায় এক সপ্তাহ বন্ধ রাখার পর ওই বছরের ২৯ জুলাই ছাত্রাবাস খোলা হয়। গত বছরের ৬ আগস্ট রাতে ছাত্রাবাসের ৭ নম্বর ব্লকের কয়েকটি কক্ষ ও নতুন ভবন দখল তৎপরতার মুখে সর্বশেষ ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এ বছর করোনা পরিস্থিতির কারণে গত ২৫ মার্চ থেকে বন্ধ ছিলো ছাত্রাবাস।

ছাত্রলীগ নেতা সাইফুরের দখলে হোস্টেল সুপারের বাংলো : গণধর্ষণের এ ঘটনায় হওয়া মামলার প্রধান আসামি ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে দখলে করে রেখেছে হোস্টেল সুপারের বাংলো। ধর্ষণকাণ্ডের পর গত শুক্রবার রাতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানে এমনটা জানতে পেরেছে।

পুলিশ জানিয়েছে, এমসি কলেজ হোস্টেল সুপারের বাংলোতে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে অবস্থান করছে আসামি সাইফুর রহমান। তার দখলে থাকা ওই বাংলো থেকেই পাইপগানসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে একটি মামলাও হয়েছে।

শাহপরান থানার ওসি কাইয়ুম চৌধুরী জানান, দীর্ঘদিন ধরে হোস্টেল সুপারের বাংলোটি ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমানের দখলে রয়েছে। ওই বাংলোতে তার ব্যবহূত কক্ষ থেকেই একটি পাইপগান, চারটি রামদা, একটি ছুরি ও দুটি লোহার পাইপ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে পৃথক আরেকটি মামলাও হয়েছে।

ছাত্রলীগের ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা : গৃহবধূকে গণধর্ষণের এ ঘটনায় এমসি কলেজ ছাত্রলীগের ৯ নেতাকর্মীকে আসামি করে গতকাল রাত ৩টার দিকে ধর্ষণের শিকার তরুণীর স্বামী মাইদুল ইসলাম শাহপরাণ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ছয়জনের নাম উল্লেখপূর্বক আরও দু-তিনজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।

আসামিরা হলো— এমসি কলেজ ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর, শাহ রনি, অর্জুন, মাহফুজ, রবিউল ও তারেক। তারা সবাই সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক রণজিৎ সরকারের অনুসারী বলে জানা গেছে। গতকাল পর্যন্ত তাদের একজনকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। যদিও তারা সরব রয়েছে ফেসবুকে।

এদিকে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন এমসি কলেজের শিক্ষার্থীরা। গতকাল শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এমসি ও সরকারি কলেজের প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী কলেজের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।

এতে টিলাগড়-শাহপরান রোডে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এসময় শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে কলেজ বন্ধ থাকার পরও ছাত্রাবাস কিভাবে খোলা রাখে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এসব অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের অবগত থাকার পরও কেন ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেয়া হলো না।

ছাত্রদের হল ছাড়ার নির্দেশ : এদিকে গণধর্ষণের ঘটনার পর সকল ছাত্রকে হল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। গতকাল দুপুর ১২টার মধ্যে হোস্টেল ছাড়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিন জানান, এমসি কলেজের অধ্যক্ষ গতকাল দুপুরে জরুরি বৈঠকের আহ্বান করেছেন। এ বৈঠকে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

তদন্ত কমিটি গঠন : এ ঘটনায় তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। কলেজের গণিত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও হোস্টল সুপার প্রফেসর আনোয়ার হোসেন চৌধুরীকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়। এ তথ্য নিশ্চিত করে কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ আহমদ বলেন, হোস্টেলের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য এ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

শিক্ষকদের রুমও দখলে রেখেছিল ছাত্রলীগ : সিলেটের এমসি কলেজের হোস্টেলে শিক্ষকদের জন্য বরাদ্দকৃত রুম নিজেদের দখলে রেখেছিলেন তরুণীকে গণধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। দীর্ঘদিন ধরে এসব নেতাকর্মী শিক্ষকদের রুম দখলে রাখলেও কলেজের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

তবে সিলেট এমসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ আহমদ বলেন, আমরা শিক্ষকদের রুম দখলের বিষয়টি জানতে পেরে শাহপরান (রহ.) থানা পুলিশকে অভিহিত করি। এছাড়া রুমে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেই। এর বাইরে আমাদের আর কিছু করার ছিলো না।

তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তরা সবাই কলেজের সাবেক ছাত্র। এজন্য আমরা কলেজ থেকে তাদের বিরুদ্ধে একাডেমিক কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছি না। তবে আমরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অভিযুক্ত ছাত্রদের সনদ বাতিলের সুপারিশ করবো।

এদিকে গত বুধবার রাতে খাগড়াছড়ি জেলা শহরের গোলাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন একটি বাড়িতে রাতে দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে প্রতিবন্ধী এক নারীকে গণধর্ষণ এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণের শিকার নারীর মা বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন, আর বলছিলেন, কী অপরাধ ছিলো আমার অসহায় মানসিক বিপর্যস্ত মেয়েটির? চোখের সামনে মানুষ নামের নরপশুরা আমার অসহায় মেয়েটিকে হাত-পা বেঁধে পাশবিক নির্যাতন করেছে। মেয়েকে দানবদের হাত থেকে বাঁচাতে চাইলে আমাদেরও তারা নির্মমভাবে পিটিয়েছে।

কান্না করতে করতে এই মা বলেন, এই দেশ কি আমাদের না? আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? আমার মেয়ের ওপর যারা পাশবিক অত্যাচার করেছে, আমি তাদের বিচার চাই। মেয়েটির আত্মীয়রা জানান, ধর্ষকরা ওই এলাকার সেটেলার। তারা ৯ জন মিলে অসহায় এই নারীকে ধর্ষণের পর তার বাড়িতেও লুটপাট চালায়। পাহাড়ে প্রতিনিয়ত ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীদের মতো তিনিও একজন, যিনি জানেন- এই রাষ্ট্র তার সম্ভ্রমহানির বিচার করতে পারবে না।

খাগড়াছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. গোলাম আফসার জানান, যে জায়গায় ঘটনাটি ঘটেছে, তার ৩০০ থেকে ৪০০ গজের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুটি চেকপোস্ট আছে। যারা ঘটনাটি ঘটিয়েছেন, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে পারবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, কাছাকাছি নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের ঘটনা ঘটা খুবই দুঃখজনক। এ ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

এছাড়া গত এক মাসের মধ্যে বান্দরবানের লামায় এক ত্রিপুরা নারীকে গণধর্ষণ, খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে মারমা সমপ্রদায়ের এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ এবং খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় নাজমুল হাসান নামে এক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে চাকমা সমপ্রদায়ের ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠে। অভিযুক্ত একজন ধর্ষককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় এক নেতা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মহালছড়ির ধর্ষণের ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন।

২০১৮ সালের ২৮ জুলাই খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলার নয়মাইল এলাকায় ১০ বছরের শিশু কৃত্তিকা ত্রিপুরা পূর্ণাকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। মেয়ের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ নিয়ে পূর্ণার মায়ের আহাজারি সেদিন রাষ্ট্রের কানে পৌঁছায়নি।

পাহাড়ে এ পর্যন্ত ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার মতো জঘন্য যত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে, তার কোনোটিরই সঠিক বিচার হয়নি, যা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ। বিচার না হওয়ায় পাহাড়ে নারীর প্রতি সহিংসতা দিন দিন বেড়েই চলছে। পাহাড়িদের অনেকেই মনে করেন, শান্তি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ক্রমেই বেড়ে চলছে।

তিন পার্বত্য জেলাসহ সারা দেশে নারী নির্যাতন, ধর্ষণের ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাঙামাটিতে গতকাল শনিবার মানববন্ধন হয়েছে। জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে সম্মিলিত ছাত্র ও সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

ওম্যান অ্যাকটিভিস্টের সমন্বয়ক সুস্মিতা চাকমা বলেন, গত এক মাসের মধ্যে বান্দরবানের লামায় এক ত্রিপুরা নারীকে, খাগড়াছড়ির মহলছড়িতে এক মারমা স্কুলছাত্রীকে গণধর্ষণ করা হয়। একই জেলার দীঘিনালা উপজেলায় এক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ৬ষ্ঠ শ্রেণিপড়ুয়া স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সর্বশেষ বুধবার রাতে খাগড়াছড়িতে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী মেয়েকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ে এমন ঘটনা শুধু এগুলো নয়, অতীতেও হাজার হাজার ঘটনা ঘটেছে। সুষ্ঠু বিচার না হওয়ার কারণে এ ধরনের ঘটনা বেড়েই চলছে।

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান বলেন, সারা দেশসহ তিন পার্বত্য জেলায় প্রতিনিয়ত নারীরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। একটি স্বাধীন দেশে নারীরা নিরাপদে ঘোরাফেরা করতে পারে না, এটা মেনে নেয়া যায় না। ধর্ষণের বিচার না হওয়ায় একের পর এক এমন জঘন্য ঘটনা ঘটছে।

গত এক মাসে পাহাড়ে চারটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও একটিরও বিচার হয়নি। ছাত্র সংগঠনের মানববন্ধনে বক্তারা আরও বলনে, গত বৃহস্পতিবার খাগড়াছড়ি এবং শুক্রবার সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে নারী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এই অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবি জানান।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest