শনিবার, ১৫ মে ২০২১, ০২:০২ পূর্বাহ্ন

ইরফানের নেপথ্যে দখলদারি চাঁদাবাজি!

ইরফানের নেপথ্যে দখলদারি চাঁদাবাজি!

খায়রুল আলম রফিক :
সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমের জীবনের বড় একটি অংশই কেটেছে দেশের বাইরে। পড়াশোনার সুবাদে কানাডায় ছিলেন বহু বছর। সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে ছিল নিয়মিত যাতায়াত। সেখান থেকেই তাকে পেয়ে বসে ভয়ংকর সব নেশা। আর সেখানেই বহু কাহিনী জন্ম দেয়।

এই নেশা কেবল মাদকের নয়, বরং সিনেমার ভিলেনের মতো চলার নেশা। এমন চিন্তা থেকেই তিনি অত্যাধুনিক প্রযুক্তির নিজস্ব ‘নেটওয়ার্কিং সিস্টেম’ গড়ে তোলেন। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অন্তত অর্ধশত ব্যক্তিকে সম্পৃক্ত করেন।

দখলদারি ও চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এবং রাস্তায় বের হয়ে চলাচলে ছিল তার নিজস্ব ‘সিগন্যাল ব্যবস্থা’। তার কথা না শুনলে শায়েস্তা করতে ছিল ‘টর্চার সেল’। বিভিন্ন সময়ে বাইরে বের হলে সঙ্গে রাখতেন ‘কমান্ডো নাইফ’, পিস্তলসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র ও বিদেশি মদের বোতল।

আর এসবকে ইরফান বলছেন ‘হবি’ বা শখ। চকবাজারের রাজসিক প্রাসাদ ‘চাঁন সরদার দাদা বাড়ি’ থেকে র‌্যাবের হাতে আটকের পর ইরফান সেলিম সম্পর্কে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে।

এলাকাবাসীও এসব তথ্যের অনেক কিছুই নিশ্চিত করেন ২৪ ঘন্টা নিউজের কাছে ।

এর আগে সোমবার রাতে সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিম ও তার দেহরক্ষী মোহাম্মদ জাহিদকে গ্রেফতার করে র‌্যাব।

শুরুতে ইরফানকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক বছরের কারাদণ্ডের খবর জানালেও পরে তাকে দেড় বছর এবং জাহিদকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেয়ার কথা জানায় র‌্যাব।

এরপর রাত সাড়ে ১২টায় তাদের নেয়া হয় কারাগারে। সেখানে তারা কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন। এদিকে মঙ্গলবার নৌবাহিনী কর্মকর্তাকে মারধর ও হত্যাচেষ্টা মামলায় ইরফান সেলিম ও জাহিদকে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ দেখিয়ে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করে ধানমণ্ডি থানা পুলিশ।

এই আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে আজ। এদিন রাত সোয়া ১১টায় চকবাজার থানায় ইরফান ও জাহিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদক আইনে পৃথক চারটি মামলা করা হয় বলে জানায় র‌্যাব।

এছাড়া সোমবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ডিবি পুলিশ এমপি হাজী সেলিমের প্রটোকল কর্মকর্তা এবি সিদ্দিক দিপুকে টাঙ্গাইল শহর থেকে গ্রেফতার করে। তার তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

এর আগে এই মামলায় একদিনের রিমান্ডে নেয়া হয় হাজী মো. সেলিমের গাড়িচালক মো. মিজানুর রহমান খানকে। এই মামলার তদন্ত ‘প্রভাবমুক্ত’ভাবে করা হবে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম।

ইরফান সেলিমকে আটকের পর চকবাজারে গিয়ে বিতর্কিত জমি দখলের পাশাপাশি পছন্দের ভবন, মার্কেট ও দোকান নিজেদের নামে নিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায় এমপি হাজী সেলিম ও তার ছেলে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে।

তাদের কথায় কেউ রাজি না হলে নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকিতে এলাকাছাড়া করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। তাদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি সরকারি জমিও। ভয়ে হাজী সেলিম ও ইরফান সেলিমের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পেত না কেউ।

যদিও এখন অনেকেই কথা বলছেন। চকবাজারে ফরিদ হোসেন নামের একজন জানান, আশিক টাওয়ারে ছিল তাদের মূল টর্চার সেল। এখানে ব্যবসায়ীদের নিয়ে নির্যাতন করা হতো।

ভবন, জমি ও দোকান দখলেও প্রকৃত মালিককে টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতন করত তারা। শুধু মদিনা আশিক টাওয়ারে ১৪ তলায় নয়, এমন আরও টর্চার সেল রয়েছে তাদের।

চকবাজারের অতি পরিচিত জাহাজ বিল্ডিং দখলে নেয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে তাদের বিরুদ্ধে। আর নির্বিঘ্নে দখল ও অনিয়ম চালিয়ে যেতে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী বিভিন্ন ব্যক্তিকে ‘ম্যানেজ’ করত সে।

ইরফান সেলিমকে গ্রেফতারের পর পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার এলাকায় স্থানীয় সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের দখলে থাকা জমি উদ্ধার করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক।

সোমবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা ছাড়াই হাজী সেলিমের দেয়া সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দখলকৃত জমি বুঝে নিয়েছেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা। মে মাসে দখল হয়ে গেলেও এতদিন নিশ্চুপ ছিল ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

জমি উদ্ধারের বিষয়টি ২৪ ঘন্টা নিউজকে নিশ্চিত করেছেন অগ্রণী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) আবদুস সালাম মোল্যা।

ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীর মৌলভীবাজার এলাকায় ১৪ শতাংশ জমির ওপর একটি দুইতলা ভবন ছিল। স্বাধীনতার পর নির্মিত ভবনটি অনেক পুরনো হওয়ায় কিছুদিন আগে নতুন ভবনে শাখা স্থানান্তর করা হয়েছে।

ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর ব্যাংকের শাখাটিও বন্ধ ছিল। এখানে দায়িত্বরত নিরাপত্তা প্রহরী ভল্ট পাহারা দিতে ভেতরে অবস্থান করেন।

সেই সুযোগে চলতি বছরের মে মাসে আমাদের পুরনো ভবনটি গুঁড়িয়ে দিয়ে দখলে নেন হাজী সেলিম। সোমবার সীমানাপ্রাচীরের গেটের তালা ভেঙে তা দখলে নিয়েছি আমরা। পুরনো ভবনে ব্যাংকের অনেক সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছিল বলে জানান ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

র‌্যাব সূত্র জানায়, সোমবার দুপুরে গ্রেফতারের সময় ইরফান মদ্যপ অবস্থায় ছিল। রাত সাড়ে ১২টায় র‌্যাব-৩ থেকে কারাগারে পাঠানোর আগ পর্যন্ত নেশাগ্রস্ত ছিলেন তিনি।

রোববার রাত থেকে অভিযানের আগ পর্যন্ত পান করেছেন আড়াই বোতল বিদেশি মদ। স্ত্রীর সঙ্গে অভিমান করে একসঙ্গে এত মদ পান করেছেন বলে জানান তিনি (ইরফান)।

র‌্যাবের অভিযানকালে চকবাজারের রাজসিক প্রাসাদ ‘চাঁন সরদার দাদা বাড়ি’র চতুর্থ তলায় অবস্থান করছিলেন ইরফান। আর তার স্ত্রী তখন ভবনের তৃতীয় তলায় ছিলেন।

নেটওয়ার্কিং সিস্টেম : কানাডায় পড়াশোনা করে এসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হন ইরফান সেলিম। কানাডায় পড়ার কারণে বাংলায় কথা বলতে অভ্যস্ত নন তিনি।

র‌্যাব কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার বেশিরভাগ কথা হয় ইংরেজিতে। ইরফানের গ্রেফতার সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুরো এলাকায় নিজস্ব নেটওয়ার্কিং সিস্টেম গড়ে তোলেন ইরফান।

অর্ধশত ওয়াকিটকির মাধ্যমে পুরো এলাকা ছিল তার নজরদারিতে। গ্রেফতারের সময় তার বাসা থেকে কালো রঙের অবৈধ ৩৮টি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest