শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:৫৬ অপরাহ্ন

ঢোকা কঠিন হচ্ছে আওয়ামীলীগে?

ঢোকা কঠিন হচ্ছে আওয়ামীলীগে?

বিশেষ সংবাদদাতা
আওয়ামী লীগে পদ-পদবী পাওয়া কঠিন হচ্ছে। এখন থেকে চাইলেই যে কেউ কাউকে ম্যানেজ করে দলটির কোনো পদে যে কেউ আসতে পারবে না। এ জন্য আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীর দুই অংশ, কয়েকটি জেলার পূর্ণাঙ্গ কমিটিসহ বেশ কিছু উপকমিটির তালিকা কেন্দ্রে জমা হয়েছে। তবে এসব কমিটিতে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কয়েক দফায় খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে দুয়েকটি কমিটির কয়েকজনের বিষয়ে এরইমধ্যে আপত্তি এসেছে। এমনকি কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের প্রস্তাবিত কমিটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল (অব.) খন্দকার আবদুর রশীদের ফ্রিডম পার্টির কর্মীরা স্থান পেয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও কয়েকটি কমিটিতে যোগ্যদের বাদ দিয়ে স্থানীয় নেতাদের পছন্দের ব্যক্তিদের পদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এবারের কমিটি করতে দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিষ্কার বার্তা কোনোক্রমেই বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের কোথাও জায়গা দেওয়া হবে না।
এ প্রসঙ্গে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘যেসব কমিটি ইতোমধ্যেই কেন্দ্রে জমা দেওয়া হয়েছে সেগুলো এখনই ঘোষণা করা হবে না। যাচাই-বাছাই করে পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের নাম তালিকায় আছে কি-না- তা দেখা হবে।’ গত শনিবার ওয়েস্টার্ন বাংলাদেশ ব্রিজ ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের (ডব্লিউবিবিআইপি) অগ্রগতি পর্যালোচনা সভায় তিনি তার সরকারি বাসভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সভায় যুক্ত হয়ে আরো বলেন, ‘স্বজনপ্রীতি ও নিজেদের লোক দিয়ে কমিটি দেওয়া হয়েছে কি-না- তা খতিয়ে দেখা হবে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে। অবিতর্কিত ও ত্যাগীদের কমিটিতে অগ্রাধিকার অবশ্যই দিতে হবে এবং বিতর্কিতদের বাদ দিতে হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর থেকেই বিরোধী মতাদর্শী নেতাকর্মীদের দলে ভেড়ার যে প্রবণতা শুরু হয়, ২০১৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রবণতা বেড়েছে কয়েকগুণ। পরবর্তীতে সেই ধারা অব্যাহত থাকে। একপর্যায়ে দলের নাম ভাঙিয়ে এসব অনুপ্রবেশকারী, বিতর্কিত এমপি ও নেতারা নানা অপকর্মে জড়িয়ে পরে। টেন্ডারবাজি, জমিদখল, মাদককারবারি ও ক্যাসিনোকাণ্ড থেকে সর্বশেষ রিজেন্ট হাসপাতালের কেলেঙ্কারিতেও এদের নাম উঠে আসে। বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের এসব অপকর্মে দল ও সরকারকে বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। এর দায়ভার অনেকটা আওয়ামী লীগকেও নিতে হয়েছে। এজন্য এবার তৃণমূল থেকে শুরু করে কোনো কমিটিতেই যেন বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীদের জায়গা না হয় সেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সভায় জেলা কমিটি অনুমোদন এবং কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য মনোনয়ন নিয়ে আলোচনা হয়। ওই সভায় দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্টই জানিয়ে দেন, বিতর্কিতদের দলে স্থান দেওয়া যাবে না। দুঃসময়ের পরীক্ষিত ও ত্যাগীদের দলের নেতৃত্বে আনতে হবে। এ সময় তিনি জমা পড়া কমিটিগুলো যাচাই-বাছাইয়ের কথাও বলেন।

ইতোমধ্যে সারা দেশে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারী প্রায় সাড়ে আট হাজার ব্যক্তির একটি তালিকা কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে হস্তান্তর করেছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে এসব ব্যক্তিরা যেন কোনোভাবে কোনো পদ না পায়, সে ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনাও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টদের। এখন যেসব পূর্ণাঙ্গ কমিটির খসড়া ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে জমা হয়েছে, কেন্দ্রীয় নেতারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তা খতিয়ে দেখে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে খসড়া পূর্ণাঙ্গ কমিটি দলীয় সভানেত্রীর কাছে জমা দেবেন। প্রধানমন্ত্রী চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ ও যাচাইবাছাই করার পরই এসব পূর্ণাঙ্গ কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদন মিলবে। তার আগে নয়।
অন্যদিকে এবার তৃণমূলের কমিটিতে ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের জায়গা দিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলার প্রভাবশালী নেতাদের নিজস্ব বলয় ভাঙতে চায় আওয়ামী লীগ। বিগত সময়ের মতো এবার যাতে ‘পকেট কমিটি’ গঠন না হয় তার জন্য সতর্ক ক্ষমতাসীন দলটি। এবার দলটির নীতিগত অবস্থান হলো, কমিটিতে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে পরীক্ষিতদের স্থান দিতে হবে। যার কারণে জমা পড়া জেলা কমিটিগুলো অতীতের মতো ঢালাওভাবে অনুমোদন না দিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তৃণমূলের কমিটির মতো দলের কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য মনোনয়নের ক্ষেত্রেও একই পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা গেছে, অতীতে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলার প্রভাবশালী নেতারা তাদের ‘মাইমেন’ বা অনুগতদের জেলা ও উপজেলাসহ তৃণমূলের কমিটিতে স্থান দিয়েছে।
এ সুযোগে বিতর্কিত ও অনুপ্রবেশকারীরা আওয়ামী লীগের অবস্থান পোক্ত করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এমপি পুত্র, স্ত্রী-সন্তান ভাই-বোনসহ আত্মীয়-স্বজনদের চাঁদাবাজি,ডিও লেটার বাণিজ্য,চুলার বাণিজ্য, নামে- বেনামে বিএনপি- জামাত সদস্যদের দেওয়া, তৃণমূলের আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে দেখা গেছে। এতে ক্ষোভে-দুঃখে-হতাশায় তৃণমূলের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতারা সংগঠন বিমুখ হয়ে পড়েন।
যার কারণে আওয়ামী লীগের তৃণমূল সংগঠন ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে এখন থেকে তৃণমূল আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যারা নিবেদিতপ্রাণ বলে পরিচিত, দলের দুর্দিনে যারা ত্যাগী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন, তাদের মূল্যায়ন করতে চান আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সামনে আরো যেসব জেলা-উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কমিটি করতে কঠোর নজরদারি করবে দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এজন্য দলের নিজস্ব ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় এসব কমিটি যাচাই-বাছাই করা হবে। প্রতিটি বিভাগের জন্য বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, প্রতি দুটি বিভাগের জন্য একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং প্রতিটি বিভাগের জন্য সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করবেন। এছাড়া দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে যাদের বাড়ি যে এলাকায় তারা ওই এলাকার যাচাই-বাছাইয়ে সহযোগিতা করবেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রহমান বলেন, ‘যোগ্য ও ত্যাগীরা যাতে কমিটিতে স্থান পায় এবং বিতর্কিতরা যাতে আসতে না পারে তার জন্য আমরা যাচাই-বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘অতীতে কমিটি নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। কোনো কোনো কমিটিকে আপনারা সাংবাদিকরা পকেট কমিটি বলেছেন। আমি সেভাবে বলতে চাই না। তবে একক কোনো ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে কমিটি চলে যাবে, এমনটা যে না হয় আমরা সেটা চাইব।’
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘যেসব জেলা ও মহানগর কমিটি জমা হয়েছে। সেগুলো যাচাইবাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যারা এখনো কমিটি জমা দেননি, তাদের কমিটি জমা দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে কোনো বিতর্কিত, অনুপ্রবেশকারী ও হাইব্রিডরা ঠাঁই পাবে না। একইভাবে উপজেলা ও পৌর কমিটিগুলোতেও যাতে এরা ঠাঁই না পায়, সেটা জেলা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের কঠোরভাবে বলা হয়েছে। এরপরও কোনো কমিটি বা কোনো ব্যক্তি নিয়ে যদি বিতর্ক দেখা দেয়, বা আমরা অভিযোগ পাই, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আমরা ব্যবস্থা নেব।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest