মঙ্গলবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২০, ০৬:০৪ অপরাহ্ন

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা হচ্ছে তৃণমূল থেকে আসা অভিযোগের স্তূপ

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা হচ্ছে তৃণমূল থেকে আসা অভিযোগের স্তূপ

বিশেষ প্রতিনিধি :
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পতাকা
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিশেষত জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল আওয়ামী লীগে বাড়ছে দ্বন্দ্ব। এ দ্বন্দ্ব মতবিরোধের সীমা ছাড়িয়ে ঠেকেছে হতাহতের ঘটনায়। প্রতিনিয়তই কোনো না কোনো এলাকায় দৃশ্যমান হচ্ছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ছাপ। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তরে জমা হচ্ছে তৃণমূল থেকে আসা অভিযোগের স্তূপ। কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ক্ষমতাসীন দলের এক নেতার বিরুদ্ধে অন্য নেতার মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলনও হচ্ছে কোথাও কোথাও। তবে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান সমাধান আসেনি দলটির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নীতিনিধারণী পর্যায়ের নেতাদের বিশ্বাস, সময়মতো সব ঠিক হয়ে যাবে। তাদের ভাষ্য- অভিযোগের সূত্র ধরে ইতোমধ্যে সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা কাজ করে যাচ্ছেন। যাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ও দলীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর প্রথম ধাপের ৫৮ ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা শতাধিক। জানা গেছে, দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করছেন স্থানীয় অনেক নেতা ও সাংসদ। নেতা বা এমপির পছন্দের প্রার্থী না হলেই তার বিপক্ষে কয়েকজনকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

পৌরসভার নির্বাচন সামনে রেখেও সারাদেশে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি কেন্দ্র করে তৃণমূল আওয়ামী লীগ কমিটিও সেভাবে করার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। একই সূত্র ধরে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে মামলা-হামলাও হচ্ছে।

পৌরসভার মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ায় গত শনিবার ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুদুর রহমান ওরফে শুভ্রকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এ হত্যায় জড়িত থাকতে পারে বলে শুভ্রর পরিবারের ধারণা।
নেত্রকোনা জেলার তিন উপজেলায় ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে চরমে। এর মধ্যে একটি উপজেলায় হামলা-পাল্টাহামলার ঘটনাও ঘটেছে। এর সূত্র ধরে পক্ষে-বিপক্ষে অর্ধশতাধিক প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।

গত ১৪ অক্টোবর সেগুনবাগিচায় রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য জিল্লুল হাকিমের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করে তার নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতারা। সাংসদ জিল্লুল হাকিম ও তার ছেলে আশিক মাহমুদের বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন, হামলা-মামলার অভিযোগ তুলে ধরেন তারা। তাদের অভিযোগ ছিল সাংসদ ও তার পুত্রের ‘ক্যাডার বাহিনী’র অত্যাচার, খুন, হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগকে। এক যুগে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৩৯ নেতাকর্মী খুন হয়েছেন জিল্লুল হাকিমের ক্যাডার বাহিনীর হাতে। পঙ্গু হয়েছেন শতাধিক নেতাকর্মী। সংখ্যালঘু পরিবারের অনেকের জমি দখল করা হয়েছে।

ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা-সদরপুর-চরভদ্রাসন) আসনের সাংসদ নিক্সন চৌধুরী ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাফরউল্লাহর সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে চরম দ্বন্দ্ব। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে এ দ্বন্দ্ব বাড়ছে। এই দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যে যে কোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে।

তৃণমূলের অন্য এলাকার মতো অভ্যন্তরীণ কোন্দল অব্যাহত আছে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের এলাকা নোয়াখালীতেও। জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী নিজের মতো করে ওই এলাকায় দল পরিচালিত করছেন। জেলা কমিটিতে অনুপ্রবেশকারী ও রাজাকার আলবদর পরিবারের সন্তানদেরও তিনি জায়গা দিয়েছেন। এ নিয়ে নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ বিরাজ করছে।

জানতে চাইলে শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র শহীদউল্লাহ খান সোহেল আমাদের সময়কে বলেন, প্রস্তাবিত নোয়াখালী জেলা কমিটিতে এমন অনেকেই আছেন, যারা ২০০৮ সালের আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। এমনকি এক সময় জামায়াত, পরে বিএনপি করেছেন- এমন লোককেও জেলা কমিটিতে রাখা হয়েছে। গত কমিটির সহসভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক- এমনকি সম্পাদকম-লীর দায়িত্ব পালন করেছে এমন অনেক ত্যাগী নেতাকে বাদ দেওয়া হয়েছে এ কমিটি থেকে। তিনি বলেন, আমার বিশ্বাস, কেন্দ্রের কাছে এসব তথ্য এরই মধ্যে গেছে। তারা যাচাই-বাছাই করে বিতর্কিতদের বাদ দেবে, ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবে।

এ ছাড়া ঠাকুরগাঁও, খুলনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কক্সবাজার, সিলেট জেলা ও মহানগর, হবিগঞ্জ, রাজশাহী জেলা এবং মহানগরসহ অন্তত ২৪ জেলা সাংগঠনিক ইউনিটে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিরাজ করছে।

এসব বিষয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করা এটি ভালো বিষয় না। আমি মনে করি, এই পথ পরিহার করে তারা (বিদ্রোহী) দলের শৃঙ্খলা মেনে দলীয় প্রার্থীর জন্য কাজ করবে। তিনি বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে কোনো অন্যায় করা যাবে না। তিনি বলেন, কেউ যদি নিজের প্রভাব খাটিয়ে মাইম্যান প্রতিষ্ঠা করতে চান এবং ত্যাগী নেতাকর্মীদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেন, তা হলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠনে এক একটি এলাকায় একাধিক যোগ্য প্রার্থী আছে। ফলে প্রতিযোগিতা থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এটি যেন কোনোভাবেই প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়, সে বিষয়ে ইতোমধ্যে জেলার নেতাকর্মীদের সতর্ক করা হয়েছে। খুব শিগগির এদের নিয়ে পৃথকভাবে বসে তৃণমূল আওয়ামী লীগে ঐক্য সৃষ্টি করা হবে।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest