শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ০৪:২২ পূর্বাহ্ন

মাদ্রাসা ছাত্রীর সম্ভ্রমের মূল্য ৯০ হাজার আর গৃহবধূর আশি!

মাদ্রাসা ছাত্রীর সম্ভ্রমের মূল্য ৯০ হাজার আর গৃহবধূর আশি!

বগুড়ার শেরপুরে গ্রাম্য সালিশের নামে দুই ধর্ষণ ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে গ্রাম্য মাতব্বরদের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি ধর্ষণের শিকার ওই দুই নারীর সম্ভ্রমের মূল্য নির্ধারণ করে জরিমানাও আদায় করেছেন তারা। এরমধ্যে মাদ্রাসা ছাত্রীকে ধর্ষণ করায় অভিযুক্ত ব্যক্তির নিকট থেকে ৯০হাজার টাকা ও গৃহবধূর ঘরে ঢুকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ৮০হাজার টাকা জরিমানাসহ জুতা-পেটার রায় দিয়ে তা কার্যকর করেন গ্রাম্য মাতব্বরা। আর পৃথক এসব ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে উপজেলার গাড়ীদহ ইউনিয়নের বড় শিবপুর ও খামারকান্দি ইউনিয়নের ঝাজর গ্রামে।

ভুক্তভোগীর পরিবার, স্থানীয় এলাকাবাসী ও গ্রাম্য মাতব্বরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ০৪ অক্টোবর দিনগত রাতে বড় শিবপুর গ্রামের স্থানীয় দাখিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী প্রতিদিনের ন্যায় রাতের খাবার খেয়ে নিজ শয়নকক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। কিন্তু মধ্যরাতে পাশের রামনগর গ্রামের আব্দুস সালামের বখাটে ছেলে মো. ছাব্বির হাসান ওই মাদ্রাসা ছাত্রীর শয়নকক্ষে ঢুকে জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে। এসময় মাদ্রাসা ছাত্রীর চিৎকারে আশপাশের লোকজন এসে হাতেনাতে লম্পট ছাব্বিরকে আটক করেন।

এরপর একইগ্রামে অবস্থিত স্থানীয় গাড়িদহ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দবিবুর রহমানের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে এবং সেখানেই ওই বখাটেকে আটকে রাখা হয়। পরদিন ওই চেয়ারম্যানের বাড়িতে এই ধর্ষণ ঘটনা নিয়ে গ্রাম্য সালিশি বৈঠক বসেন গ্রাম্য মাতব্বররা। সেখানে মোটা অঙ্কের জরিমানা নিয়ে সালিশের মাধ্যমে ঘটনাটি আপোষ-রফা করে আটকে রাখা বখাটে ছাব্বিরকে ছেড়ে নিয়ে যান তার পরিবার। তাই পরবর্তীতে ধর্ষণের শিকার মাদ্রাসা ছাত্রীর পরিবারকে আইনের আশ্রয় নিতে বাধা ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে গ্রাম্য মাতব্বর আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে। কিন্তু তিনি তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

এদিকে ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে ভুক্তভোগী ওই মাদ্রাসা ছাত্রীর বাবা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করলেও কোন মন্তব্য করতে রাজী হননি। ওই শালিসি বৈঠকে উপস্থিত থাকা গ্রাম্য মাতব্বর আব্দুল মোমিন বলেন, চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য গ্রাম্য মাতব্বররা বিচার করেছেন। সেই অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তির নিকট থেকে ৬০হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে ভুক্তভোগী মেয়ের বাবাকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তিনি এসবের মধ্যে নেই বলে দাবি করেন। এছাড়া বাকি ৩০হাজার টাকা বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে ইউপি চেয়ারম্যান দবিবুর রহমান তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ঘটনাটি আমার গ্রামের। তাই শুনেছি। এছাড়া আমি কোন বিচার-শালিস করিনি। এমনকি সেখানে উপস্থিতও ছিলাম না। তাই বিষয়টি সম্পর্কে আমার তেমন কিছুই জানা নেই বলে ফোনের সংযোগ কেটে দেন তিনি।

অপরদিকে গত ০১ অক্টোবর দিনগত রাতে উপজেলার খামারকান্দি ইউনিয়নের ঝাজর গ্রামের এক দিনমজুরের বাড়িতে ঢুকে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করেন প্রতিবেশি আজিজমুদ্দিনের ছেলে মো. হেলাল উদ্দীন। পরদিন ঘটনাটি নিয়ে গ্রাম্য মাতব্বর সোলায়মান আলীর বাড়িতে সালিশি বৈঠক বসানো হয়। সেখানে গ্রাম্য মাতব্বর সেলিম রেজা, ফারুক হোসেন, আজিজ ও টুনু অভিযুক্ত ধর্ষককে বেশ কয়েকটি জুতা-পেটা করে সালিশের সমাপ্তি টানেন। কিন্তু এই বিচার মানতে অস্বীকার করেন ধর্ষণের শিকার ওই গৃহবধূর স্বামী। পরবর্তীতে গ্রাম্য মাতব্বররা আবারও ঘরোয়াভাবে বসেন এবং ধর্ষকের নিকট থেকে ৮০হাজার টাকা নিয়ে ধর্ষিতার পরিবারকে দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী। কিন্তু এই ধরণের অপরাধ আপোষযোগ্য নয়।

বগুড়ার শিশু ও নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের এপিপি অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম মজনু বলেন, জনপ্রতিনিধি ও গ্রাম্য মাতব্বররা ধর্ষণের বিচার করতে পারেন না। এমনকি এ ধরণের অপরাধের গ্রাম্য সালিশ ও ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়া আইন অনুযায়ী দণ্ডণীয় অপরাধ। তাই ওইসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান এই আইনজীবি।

জানতে চাইলে শেরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) এসএম আবুল কালাম আজাদ এ প্রসঙ্গে বলেন, ওই দুই ঘটনার মধ্যে শিবপুর গ্রামের ঘটনার কথা শুনেছি। তারা থানায় অভিযোগ করতে আসার কথা। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া অন্য ঘটনাটি সম্পর্কে জানা নেই। তাই খোঁজখবর নিয়ে পরবর্তীতে ওই ঘটনাটি সম্পর্কে বলা সম্ভব হবে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest