বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৯:২০ অপরাহ্ন

দুদকে অভিযান বন্ধে দৌড়ঝাঁপ আসামিদের

দুদকে অভিযান বন্ধে দৌড়ঝাঁপ আসামিদের

কক্সবাজার প্রতিনিধি : দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের অংশ হিসেবে কক্সবাজারে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এ অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছে কক্সবাজারবাসী। তবে কক্সবাজারে দুদকের চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযান থেকে রক্ষার জন্য অভিযান বন্ধে দৌড়ঝাঁপ শুরু করছে সঙ্ঘবদ্ধ একটি চক্র। চাকরিচ্যুতি বা অন্যত্র বদলি করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে দুদকের অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তাকে। এমনটাই আলোচনা হচ্ছে কক্সবাজারের সর্বত্র।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারে অগ্রাধিকার ভিত্তিক মেগা প্রকল্পসহ ৭৫টি প্রকল্প উন্নয়নের কাজ চলছে। তার মধ্যে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, এসপিএম প্রকল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাইটেক পার্ক, ট্যুরিজম পার্ক, সাবমেরিন বেস, রেল ট্র্যাকস, শেখ কামাল আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম, বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, পিবিআই কার্যালয়, সারফেস ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্প অন্যতম। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০ হাজার একরের অধিক ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। তবে ভূমি অধিগ্রহণ ঘিরে শিকড় গেড়েছে অবিশ^াস্য দুর্নীতি। শাখা-প্রশাখায় গড়ে উঠেছে ভিন্ন ভিন্ন সঙ্ঘবদ্ধ দালালচক্র। যারা এরই মধ্যে ভূমি মালিকদের অধিগ্রহণ বাবদ পাওয়া ৮ হাজার কোটি টাকা থেকে কৌশলে ১৫ ভাগ থেকে ৫০ ভাগ পর্যন্ত কমিশন হিসেবে আনুমানিক দুই হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এ ছাড়াও নানা জাল-জালিয়াতি তো আছেই।
বিষয়টি নজরে এলে দুর্নীতিবাজ সঙ্ঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে কক্সবাজারে জোরালো অভিযান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। অভিযানে এর মধ্যে বড় ধরনের সফলতা পেয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যমতে, কক্সবাজার চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণকে ঘিরে দুর্নীতিতে বিভিন্নভাবে জড়িত রয়েছে দেড়শ দালাল। সেখানে জনপ্রতিনিধি, আওয়াগী লীগ নেতা, বিএনপি নেতা, আইনজীবী, সাংবাদিকের নামও রয়েছে। এ ছাড়াও কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান ৫৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। অনুসন্ধান ও গ্রেফতারকৃত সার্ভেয়ার এবং তিন দালালদের কাছ থেকে এসব তথ্য পেয়েছে দুদক।
তালিকা অনুযায়ী, অভিযান চালিয়ে এর মধ্যে কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক কাউন্সিল জাবেদ কায়সার নোবেলের ২১ কোটি টাকা জব্দ করেছে দুদক। দেশের নামকরা কয়েকটি ব্যাংকের কক্সবাজার শাখা থেকে কয়েক দফায় এসব টাকা জব্দ করা হয়। এ ছাড়াও কক্সবাজার শহরের অভিজাত হোটেল বেস্ট ওয়েস্টানে দুটি ফ্ল্যাট, ওয়ার্ল্ড বিচ হোটেলে একটি, আবাসিক বিল্ডিংয়ে একটি ফ্ল্যাট জব্দ, ইনানীতে থাকা ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকার ১ একর জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে দুদকের তদন্ত টিম। নোবেলের বিরুদ্ধে ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় বিভিন্নভাবে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
একইভাবে মিজানুর রহমানের ৪ কোটি টাকা জব্দ করেছে দুদক। গত ২৩ সেপ্টেম্বর একটি ব্যাংকের কক্সবাজার শাখায় অভিযান চালিয়ে মিজানুর রহমানের নামে এফডিআর করে রাখা ওই টাকা জব্দ করা হয়। মিজানুর রহমান সদরের ঝিলংজা ইউনিয়নের উত্তর মুহুরীপাড়ার মৃত আবদুল গণির ছেলে এবং কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেয়র মুজিবুর রহমানের স্ত্রীর বড়ভাই বলে জানা গেছে।
দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছে, অভিযানের অংশ হিসেবে কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কক্সবাজার পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান তার পরিবার ও ছেলে আওয়ামী লীগ নেতা মেহেদী হাসানের এ পর্যন্ত ৩৭ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে। গত ১৪ ও ২১ সেপ্টেম্বর পৃথক অভিযানে বিভিন্ন ব্যাংকের কক্সবাজার শাখা থেকে এসব টাকা জব্দ করা হয়েছে।
এ ছাড়াও গত ১৭ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে মেয়র মুজিবুর রহমানের ৮ দলিল জব্দ করা হয়। এর মধ্যে তিনটি ৩৩ লাখ ৯০ হাজার টাকায় বায়নাকৃত জমির দলিল, বাকি পাঁচটি আমমোক্তারনামা। জব্দ করা দলিলের জমির পরিমাণ ৮৭ দশমিক ৮৩ শতক। এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর পৌর মেয়র মুজিব ও তার পরিবারের ৬ কোটি টাকার সম্পত্তির খোঁজ পেয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদকের এ কর্মকর্তা।
যদিও কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন জেলার আওয়ামী লীগের নেতারা।
এদিকে কক্সবাজারে দুদকের অভিযানকে ঘিরে জেলার চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের মধ্যে একধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কে কখন কীভাবে দুদকের জালে আটকা পড়ে এ ভয়ে ঘুম হারাম অনেকের।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দুদকের তালিকায় নাম আসা ব্যক্তিরা নিজেদের বাঁচাতে যে যার মতো ছুটে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগামে। সেখানে গিয়ে তারা পরিচিত নেতাদের মাধ্যমে মন্ত্রী ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে দুদকের অভিযোগ থেকে মুক্তির পেতে সহযোগিতা চাইছেন।
দুদকের তালিকায় নাম আসা কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কর্মকর্তাদেরও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তারাও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে দুদকের অভিযোগ থেকে মুক্তি পেতে আকুতি জানাচ্ছে।
হেলাল (ছদ্মনাম) জানিয়েছেন, দুদকের তালিকায় নাম আসা কক্সবাজারের এক আলোচিত সাংবাদিক ঢাকায় গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। ওই সাংবাদিক নিজেকে নির্দোষ দাবি করে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তাকে শিবিরের সাবেক নেতা বলে দাবি করেন। এবং বেছে বেছে আওয়ামী লীগ নেতাদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। জবাবে মন্ত্রী নির্দোষ কোনো ব্যক্তি হয়রানি হবে না দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কেউ রেহাই পাবে না বলে মন্তব্য করেন বলে জানান হেলাল।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, মুহিব উল্লাহ ও বাবর নামের কক্সবাজার ভূমি অধিগ্রহণ এলএ শাখার দুদকের তালিকাভুক্ত দুই শীর্ষ দালাল পৃথকভাবে ঢাকায় গিয়ে কয়েকজন মন্ত্রী ও ডজনখানিক সরকারদলীয় নেতার সঙ্গে দেখা করেছেন। তবে কেউ এ পর্যন্ত তাদের দুদকের তালিকা থেকে নিজেদের নাম বাদ দেওয়ার আশ^াস দেননি বলে একাধিক সূত্রে বিষয়টি জানা গেছে। একই পথে হাঁটছেন দুদকের তালিকায় নাম আসা প্রভাবশালীরাও।
আওয়ামী লীগের এক নেতা জানিয়েছে, প্রভাবশালী এক সচিবের কাছে কক্সবাজারে অভিযানে নেতৃত্বদানকারী দুদকের কর্মকর্তা শরিফ উদ্দীনকে বদলির তদবির করেছিল একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। কিন্তু কক্সবাজারে দুদকের অভিযানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশ ও সমর্থন থাকায় সে চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যায়। তবে এ বিষয়ে আপাতত কোনো মন্তব্য করতে চান না দুদকের ওই কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গত, কক্সবাজার জেলায় চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রথম কাজ ভূমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে দালালদের সিন্ডিকেটটি তৈরি হয়েছে। এসব দালাল জমির মালিকদের নাম দিয়ে বিভিন্ন কৌশলে সরকারের কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিষয়টি নজরে আসার পর দুদক আনুষ্ঠানিকভাবে অনুসন্ধানে নামে।
অনুসন্ধানের শুরুতেই দুদক ও র‌্যাব যৌথ অভিযান চালিয়ে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ ওয়াসিম নামের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার এক সার্ভেয়ারকে ৯৩ লাখ টাকাসহ আটক করে। তার তথ্যের ভিত্তিতে পরে ২২ জুলাই মো. সেলিম উল্লাহ, ৩ আগস্ট মোহাম্মদ কামরুদ্দিন ও সালাহ উদ্দিন নামের তিন দালালকে আটক করে দুদক। আটকের সময় এসব দালালের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকার নগদ চেক ও ভূমি অধিগ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ মূল নথি উদ্ধার করা হয়।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest