রবিবার, ০৯ মে ২০২১, ০৫:১৯ অপরাহ্ন

ত্রিশালে এক শিক্ষকের সবকিছু হারিয়েছেন সরকারি সুবিধাও কেড়ে নিল বয়সে

ত্রিশালে এক শিক্ষকের সবকিছু হারিয়েছেন সরকারি সুবিধাও কেড়ে নিল বয়সে

আজাহারুল ইসলাম আজাহার :
অজোপাড়া গায়ে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে জাতিকে শিক্ষিত করে সমাজ ব্যবস্থাকে উন্নয়ন করে তুলার এক মহামানব ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার কানিহারী ইউনিয়নের বালিদিয়া গ্রামের আব্দুল ছালাম মাস্টার (৭৫) একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জীবনের সব সম্পদ খোয়ে দিয়েছেন বয়সের ভারে সরকারি সকল সুবিধা বঞ্চিত।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে গ্রামের অবহেলিত ছেলে-মেয়েদের যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা ছিল না, দু-একটা স্কুল থাকলেও দূরত্বের কারণে ছেলেমেয়েরা যেতে পারতো না, তখন এই শিক্ষানূরাগী সমাজকে পরিবর্তনে শিক্ষার ছড়িয়ে দিতে ১৯৭০ সালে একটা প্রাথমিক বিদ্যালয করার চিন্তার আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেন। নিজের উদ্যোগে নিজের সম্পদ বিক্রি করে বালিদিয়া গ্রামের ছেলেদের খোঁজে এনে এই প্রাথমিক শিক্ষাচর্চায় চালু করেন।

আব্দুস সালাম মাস্টার বয়সের ভারে একটু নুয়ে পড়লেও গুণী এই শিক্ষকের দেহের মধ্যে রয়েছে তারুণ্যের জ্বলন্ত শিখা আর অফুরন্ত সাহস।অসম্ভব বলতে কোন কিছুই যেন তিনি মানতে নারাজ।তাইতো, ১৯৭৫ সাল থেকেই বিনা-বেতনে গ্রামের অবহেলিত ছেলেমেয়েদের জন্য শিক্ষাদান শুরু করেন। ১৯৮২ সালে সুদীর্ঘ চেষ্টা,শ্রম ও নিজস্ব অর্থের বিনিময়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় স্কুলটি রেজিস্ট্রি করান যার নং-২৫২ (৫)।নাম দেন বালিদিয়া কচিকাঁচা রেজিঃ প্রাথমিক বিদ্যালয়।অতঃপর ২০১০-২০১১ মেয়াদে প্রাথমিক বিদ্যালয় যখন সরকারিকরণের আওতায় পড়ে, তার অল্প কিছুদিন আগে তিনি অবসরে চলে যান। অল্পের জন্য সরকারি সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও তার মধ্যে নেই কোন আফসোস।এ বিষয়ে সালাম মাস্টারের বড় মেয়ে সহ-শিক্ষক সানফ্লাওয়ার আইডিয়াল স্কুল ময়মনসিংহ নাজরাতুন নাইম শিলার সাথে কথা বললে তিনি জানান, বাবা জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই কাটিয়েছেন স্কুল প্রতিষ্ঠা বিনা বেতনে শিক্ষাদান ও ধর্মীয় সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজে। যার জন্য আমাদের প্রয়োজন বা দেখবাল করার সুযোগটাও বেশি হয়নি। তারপরও আমি বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেকে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত করেছি।বাবা সমাজের মানুষদের দেখিয়ে দিয়েছেন, প্রতিষ্ঠান করতে জনপ্রতিনিধি বা ধনাঢ্য না হলেও করা যায়। তার জন্য প্রয়োজন হয় মনোবল,সৎ সাহস ও দীর্ঘ প্রয়াস।
পরে ঐ গুণী শিক্ষক, শিক্ষানূরাগী সালাম মাস্টারের সাথে কথা বললে তিনি তার প্রতিষ্ঠা নিয়ে গর্ব করে বলেন, এই স্কুলে এই গ্রামের ছেলে মেয়েরা লেখা-পড়া শিখে সমাজকে আলোকিত করেছে আজ সমাজ হয়েছে শিক্ষিত।স্কুল সরকারি হয়েছে আমি আমার বয়সের কারণে সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও সুনামের সবটুকু সুবিধা আমি পেয়েছি। আমার ধন-সম্পদের অর্থ স্কুলের প্রতিটি স্থাপনায় সংযুক্ত। হয়তবা আজ আমি কিডনীসহ নানা রোগে আক্রান্ত অর্থ সমস্যা রয়েছে আমার কিন্তু স্কুল পক্ষ ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে যে সম্মানটুকু পাচ্ছি সেটা সকল রোগে ঔষধ হিসেবে সেবন করছি।সকলের কাছে দোয়া চাই।

বিষয়টি নিয়ে বালিদিয়া কচিকাঁচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক মুহিত বাবুর সাথে কথা বললে তিনি জানান ,“সালাম স্যার আমাদের এলাকার গর্ব। তিনি এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।বিনিময়ে কিছু পাবেন না জানি কিন্তু তার এই সুনাম সারা জীবন থেকে যাবে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়,৭৫ বছর বয়সী আব্দুস সালাম মাস্টার বর্তমানে বালিদিয়া কচিকাঁচা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।তিনি আশাবাদী “স্কুলের পাশেই একটা গ্রন্থাগার স্থাপন করবেন, যদিও প্রয়োজনীয় টাকার অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest