সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ০২:১৩ অপরাহ্ন

জানুর মুখে লিবিয়ায় অত্যাচারের রোমহর্ষক বর্ণনা

জানুর মুখে লিবিয়ায় অত্যাচারের রোমহর্ষক বর্ণনা

অসহায় বাবা-মায়ের টানাপোড়নের সংসারে কিছুটা সুখ ও নিজের ভাগ্য ফেরাতে মাতৃভূমি বাংলাদেশ ছেড়ে সুদূর লিবিয়ায় পারি জমিয়েছিলেন মো. জানু মিয়াসহ আরো অনেকে। সংসারে সুখ ফেরানো তো দূরের কথা, মানব পাচারকারীরা তাদের জীবনে ভয়াবহ কাল ডেকে আনে। নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়ে দেশে ফিরেছেন তারা। সেই অত্যাচারের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন জানু মিয়া।

জানু মিয়ার পরনের গেঞ্জিটা কিছুটা উঠাতেই পেটের একপাশে দেখা গেল গুলির ক্ষত। তার পাশে তখন দাঁড়িয়ে মো. বকুল হোসেন। বকুলের দিকে তাকাতেই দেখা গেল হাতের দুটি আঙুল নেই। অপরদিকে অত্যাচারের শিকার গুলিবিদ্ধ ফিরোজ ব্যাপারী এতোটাই পঙ্গু হয়ে দেশে ফিরেছেন ক্র্যাচ ছাড়া হাঁটতেই পারেন না। তাতেও খুশি এই তরুণরা। অন্তত প্রাণ নিয়ে বাবা-মায়ের কোলে ফিরতে পেরেছেন।

চলতি বছরের ২৯ মে। লিবিয়ার মিজদা শহরে চোখের সামনেই নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়ে ২৬ সহযাত্রীকে মারা যেতে দেখেছেন তারা। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহযোগিতায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) গত ৩০ সেপ্টেম্বর ৯ জনকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে।

লিবিয়াফেরত বাংলাদেশিরা হলেন- ফিরোজ ব্যাপারী, জানু মিয়া, ওমর শেখ, সজল মিয়া, তরিকুল ইসলাম, বকুল হোসেন, মো. আলী, সোহাগ আহমেদ ও সাইদুল ইসলাম। এই নয়জন ফিরে এলেও এই দলের আরো তিনজন বাপ্পী দত্ত, সম্রাট খালাসী ও সাজিদ রয়ে গেছেন লিবিয়ায়।

গত রোববার সিআইডি লিবিয়াফেরত বাংলাদেশীদের সংস্থাটির  প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে হাজির করলে দেখা মিলে তাদের উপর অত্যাচারের পাশবিক নির্যাতনের দৃশ্য।

সংবাদ সম্মেলনে মো. জানু মিয়া বলেন, তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ভৈরবে। লিবিয়ায় যেতে তিনি স্থানীয় দুই দালাল সোহাগ ও শ্যামলকে ধরেছিলেন। তাদের অফিস মতিঝিলে। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর জানু সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যান। বাসে করে কলকাতা নিউমার্কেটের কাছের একটি হোটেলে ওঠেন। সেখান থেকে পরদিন প্লেনে মুম্বাই চলে যান। ওখানকার বাঙালি দালাল তাকে দুবাই পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। সেখানেও বাঙালি দালালদের পান। ওই দালালেরা শারজায় কয়েক দিন থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন জানু মিয়ার। সেখান থেকে মিসর পৌঁছে আরো অন্তত ১০০ মানুষকে পেয়ে যান জানু। এরপর তারা পৌঁছান লিবিয়ার বেনগাজিতে। বেনগাজির একটি কারখানায় যোগ দেয়ার পর জানু মিয়া বুঝতে পারেন তার সঙ্গে প্রতারণা করেছে দালাল চক্র। মাসে ৪০ হাজার টাকা বেতন পাবেন এমন প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও তিনি ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকার বেশি পাননি।

অপহরণের শিকার হন জানু মিয়ারা 

এ সময় দালালদের প্রলোভনের বরাত দিয়ে জানু মিয়া বলেন, ত্রিপলিতে গেলে অনেক টাকা বেতনে চাকরি পাওয়া যাবে। এ পর্যায়ে যে দালালের পাল্লায় তিনি পড়েন, তার নাম তানজুল। তার বাড়িও কিশোরগঞ্জের ভৈরবে। জানু মিয়া ভয় পাচ্ছিলেন প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরের শহরে যেতে।

তানজুল বলেন, ৬০ হাজার টাকা দিলে তিনি সব দায়িত্ব নেবেন। জানু মিয়ার বড় ভাই মুন্না নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে তানজুলের বড় ভাইকে ওই টাকা পরিশোধ করেন। বেনগাজি থেকে ৩০ জন বাংলাদেশি ৩টি গাড়িতে করে রওনা দেন। গাড়ির তিন চালক ছিলেন লিবীয়। ত্রিপলি পৌঁছানোর আগে তাদের ওপর হামলা চালায় অপহরণকারীরা।

হামলার রোমহর্ষক বর্ণনা

হামলার সময় একজন গাড়ির সিটের নিচে লুকিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তি বাদে ২৯ জনকে একটি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনদিন পর তাদের সবাইকে আরেক দলের কাছে বিক্রি করে দেয়। তারা মিজদাহতে পৌঁছান ২০ মে। অপহরণকারীরা ক্যাম্পে ঢুকেই লাশ দেখতে পান।

তারা জানান, প্রত্যেকে ১২ হাজার ডলার দিলে ছাড়া পাবেন। নইলে তাদেরও মরতে হবে। প্রতিদিনই দুই থেকে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হতো। বাংলাদেশি ছাড়াও ওখানে নাইজেরিয়া, ঘানা ও সুদানের নারীসহ শতাধিক মানুষ জিম্মি ছিলেন।

জানু মিয়া আরো জানান, একদিন বেদম মারপিটের মুখে নাইজেরিয়ার নাগরিকেরা পাল্টা হামলা করে একজন অপহরণকারীকে হত্যা করেন। এরপরই সবার ওপর নির্বিচারে চালানো হয় গুলি, ছোড়া হয় ককটেল। গুরুতর আহত ১২ জন বাংলাদেশিকে অপহরণকারীরা দূরের একটা মরুভূমিতে ফেলে চলে আসে। দুই আড়াই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তারা এক সুদানি নাগরিকের আশ্রয় পান। তিনিই সেনা সদস্যদের হাতে তুলে দেন বাংলাদেশিদের। ত্রিপোলির একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও, কেউ দেখাশোনা করছিল না বাংলাদেশিদের। পরে সে দেশের বাংলাদেশি দূতাবাসের হস্তক্ষেপে চিকিৎসা হয় তাদের।

লিবিয়ার মিজদাহতে ২৬ বাংলাদেশি নিহতের ঘটনায় মোট ২৬টি মামলা হয়েছে দেশে। সিআইডি একাই করেছে ১৫টি মামলা। এ পর্যন্ত এই ঘটনায় ৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন বিভাগের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল্লা হীল বাকী জানান, লিবিয়ায় থাকা দেশীয় দালালদের ধরতে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া চলছে।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest