বৃহস্পতিবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২০, ০৯:৫১ পূর্বাহ্ন

কোরআন ‘অবমাননা’, যুবককে হত্যার পর লাশ পোড়ালো জনতা

কোরআন ‘অবমাননা’, যুবককে হত্যার পর লাশ পোড়ালো জনতা

লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বুড়িমারী স্থল বন্দর কেন্দ্রীয় মসজিদে মুসলমানদের ধর্মীয় গ্রন্থ কোরআন শরীফ অবমাননার অভিযোগে তুলে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার পর লাশ পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মাগরিবের নামাজের আগে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে ঘটে এ ঘটনা। এরপর লাশ নিয়ে বুড়িমারী প্রথম বাঁশকল এলাকায় জয় ট্রেডার্সের সামনে লালমনিরহাট-বুড়িমারী জাতীয় মহাসড়কের ওপর কাঠখড়ি ও পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে ওসি সুমন কুমার মোহন্ত জানান, ‘আজ বিকেলে মোটরসাইকেলে করে ওই মসজিদে আসে দুজন ব্যক্তি। তারা মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে কোরআনের ওপর পা তুলে দেয়। সেটা দেখে ফেলায় স্থানীয়রা তাদের মারধর করেন। পরে তাদের মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সেই আগুনে তাদের একজনকে পোড়ানো হয়।’ওসি আরো জানান, ‘আরেকজনের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, সে পালিয়ে গেছে।’বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য হাফিজুল ইসলাম ঘটনার বর্ণনা করে বলেন, ‘আসরের নামাজ শেষে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে দুই জন অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি আসেন। মসজিদের খাদেম জুবেদ আলীকে সঙ্গে নিয়ে তাদের একজন মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে কোরআন-হাদিসের বই রাখার তাকে অস্ত্র আছে বলে তল্লাশি শুরু করেন। একপর্যায়ে মসজিদের সামনে থাকা ৫-৬ জন মুসল্লি মসজিদে প্রবেশ করা ওই ব্যক্তিকে এবং বারান্দায় থাকা অপর ব্যক্তিকে মারধর করেন। খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই দুই ব্যক্তিকে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের একটি কক্ষের ভেতরে ঢুকে তালা লাগিয়ে রক্ষার চেষ্টা করি। তবে মুহূর্তে শত শত লোকজন জড়ো হতে থাকে। আমি ও স্থানীয় রফিকুল ইসলাম প্রধান নামে এক ব্যক্তি পাটগ্রাম থানার ওসি সুমন কুমার মোহন্ত, ইউএনও কামরুন নাহার, উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমীন বাবুল ও বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম নেওয়াজ নিশাতকে ফোন করে ঘটনাস্থলে আসতে বলি। এরই মধ্যে উত্তেজিত জনতা কারও কথা না শুনে পরিষদের দরজা-জানালা ভেঙে এক ব্যক্তিকে বাইরে বের করে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে লাশ নিয়ে লালমনিরহাট-বুড়িমারী জাতীয় মহাসড়কের বুড়িমারী প্রথম বাঁশকল এলাকায় কাঠখড়ি ও পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেয়। সেখানে ৫-৬ হাজার উত্তেজিত মানুষ ছিল, কারও কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা লোক দুই জনের সঙ্গে কথা বলার সময় পাইনি। তাই পরিচয় নেওয়া সম্ভব হয়নি। এমন কি তাদের ধর্ম সম্পর্কেও জানা সম্ভব হয়নি।’বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন আফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমি আসরের নামাজ শেষ করে বাইরে বের হয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পাই খাদেম জুবেদ আলীকে দুই জন অপরিচিত ব্যক্তি সালাম দিয়ে হ্যান্ডশেক করে কথা বলছিল। এরপর তারা মসজিদের ভেতরে ঢুকে যায়। আমিও চলে যাই। পরে ঘটনার কথা এসে শুনেছি। কিন্তু বিস্তারিত কিছু জানি না।’জানতে চাইলে ওই মসজিদের খাদেম জুবেদ আলী বলেন, ‘আমাকে র‌্যাব ও আর্মির পরিচয় দিয়ে বলা হয় যে, কোরআন শরীফ ও হাদিস রাখার তাকে নাকি অস্ত্র আছে। এ কথা বলে তাদের একজন খোঁজ শুরু করেন। এক পর্যায়ে সবকিছু তছনছ করেন। এসময় মসজিদের বাইরে অবস্থানরত হোসেন আলী (৩৫) নামে এক মুসল্লিসহ ৫-৬ জন মুসল্লি মসজিদে প্রবেশ করে দুই জনকে আটক করে বাইরে নিয়ে আসেন। মসজিদের বারান্দার সিঁড়িতে প্রথম দফায় তাদের মারধর করা হয়। পরে হাফিজুল ইসলাম মেম্বার এসে তাদেরকে নিয়ে যায়। এরপর কী হয়েছে আমি জানি না।’লালমনিরহাট জেলা পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা বলেন, ‘ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ ও র‌্যাব পাঠানো হয়েছে। ঘটনাস্থলে না যাওয়ার আগে কোনও মন্তব্য করতে পারছি না। তবে আপনি যা শুনেছেন, আমরাও তা শুনেছি।’ জেলা প্রশাসক আবু জাফর ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, সেখান সার্বিক পরিস্থিতি এখনই বলার মতো নয়। শুনেছি ইউনিয়ন পরিষদসহ বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। একজনকে মেরে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এসব সার্বিক বিষয়ে সরজমিনে জানার জন্য ও পরিস্থিতি বোঝার জন্য ঘটনাস্থলের পথে রয়েছি।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest