শনিবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২০, ০৫:৫৯ অপরাহ্ন

চালবাজি এখন অজুহাতে

চালবাজি এখন অজুহাতে

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক :

মিলগেটে প্রতি কেজিতে নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দুই টাকা বাড়িয়ে পাইকারি এবং পাইকারি পর্যায় থেকে প্রতি কেজিতে আরো আড়াই টাকা বাড়িয়ে খুচরা পর্যায়ে বিক্রির জন্য দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। সেই হিসাবে উৎকৃষ্টমানের মিনিকেট প্রতি কেজি ৫৩ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি করবেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। আর খুচরা ব্যবসায়ীরা তা বিক্রি করতে পারবেন ৫৬ টাকা কেজি। একইভাবে পাইকারি বাজারে মাঝারি মানের মিনিকেট বিক্রি হবে কেজিতে ৪৭ টাকা এবং খুচরা বাজারে তা ভোক্তার কাছে বিক্রি করা যাবে প্রতি কেজি ৪৯ টাকা ৫০ পয়সায়। কিন্তু খবরটি বেশিরভাগ ব্যবসায়ী জানেন না বলে অজুহাত সৃষ্টি করেছেন। এ কারণে কোনো বাজারেই নির্ধারিত দামে চাল বিক্রি হচ্ছে না। তাদের এই অজুহাতের মারপ্যাঁচে এখন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে চালের বাজার। কোনোভাবেই চালের দামে লাগাম টানা যচ্ছে না।
চালের দাম নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও বাজারে তা বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে মিলার ও আড়তদাররা পরস্পরকে দোষারোপ করছেন। আড়তদারদের অভিযোগ, মিলারদের কারণে চালের দাম কমেনি। একইভাবে মিলাররা অভিযোগ করেন চালের বাজারে অস্থিতিশীলতার জন্য আড়তদাররাই দায়ী। আড়তদারদের কথায়, ‘মূল্য নির্ধারণের বৈঠকে মিলাররা সম্মতি জানালেও তারা সেই দামে চাল বিক্রি করছেন না। তাই পাইকারি কিংবা খুচরা বাজারে দাম কমেনি। মিলাররা দাবি করছেন, সরকার নির্ধারিত দামে চালের পাইকারি ব্যবসায়ী ও আড়তদাররা চাল কিনছেন না। তারা নিজেদের মজুদ করা চালই বেশি দামে বিক্রি করছেন। এ কারণে চালের খুচরা বাজার স্থিতিশীল হয়নি।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী বলেন, আমরা সরকার নির্ধারিত মূল্যে চাল বিক্রির জন্য বসে থাকলেও আড়তদাররা কিনছেন না। কারণ এই দামে কিনলে তো কম দামে বিক্রি করতে হবে। তারা বেশি মুনাফার আশায় মজুদ করে রাখা শত শত টন চালই বিক্রি করছেন এখন। অথচ অযৌক্তিকভাবে আমাদের দায়ী করা হচ্ছে।
এর আগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার আব্দুল গণি সড়কে খাদ্য ভবনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত চালকল মালিক, পাইকারি ও খুচরা চাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর চালের পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করে দেয়। সংস্থাটির মহাপরিচালক মোহম্মদ ইউসুফ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এরপরও চালের বাজার নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলছে। কারণ মিলগেটে দাম নির্ধারণের খবর ব্যবসায়ীদের কানে গেলেও পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে চালের বিক্রয়মূল্য ঠিক করে দেওয়ার খবর তাদের অধিকাংশই জানেন না। এ কারণে কোথাও সরকার নির্ধারিত দামে চাল বিক্রি হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে রাজধানীর বাদামতলী-বাবুবাজার চাল আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক নিজামউদ্দিন বলেন, মিলগেটে নির্ধারিত দামের অতিরিক্ত দুই টাকা খরচ হয়ে থাকে তাদের। এর সঙ্গে প্রতি কেজিতে এক টাকা হোক আর ৫০ পয়সা হোক মুনাফা তো করতে হবে। এটুকু লাভ না করলে খাবো কী? কাজেই পাইকারি পর্যায়ে চাল প্রতি কেজি ৫৪ টাকার কম দামে বিক্রি করলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবো। সরকার তথা খাদ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়কে এটা বুঝতে হবে। খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, তারা অনৈতিক কোনো মুনাফা করেন না। কোনাপাড়া বাজারের রহিম জেনারেল স্টোরের মালিক আবদুর রহিমের মন্তব্য, পাইকারি বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে চাল বিক্রি হয় না। তিনি বলেন, ‘আমরা বাদামতলী পাইকারি বাজার থেকে যে দামে চাল কিনি, তার সঙ্গে পরিবহন খরচ ও মুনাফাসহ প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ তিন টাকা বাড়িয়ে বিক্রি করা হয়। সরকার নির্ধারিত দামে পাইকারি বাজার থেকে চাল কিনতে পারলে আমাদের সেই অনুযায়ী বিক্রি করতে তো সমস্যা নেই।
এ প্রসঙ্গ কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, কোনো বাজারে পাইকারি বা খুচরা পর্যায়ে সরকার নির্ধারিত দামে চাল বিক্রি না হলে অভিযুক্ত ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে সরকার। তার মুখে শোনা গেলো, এক্ষেত্রে অভিযোগ পেলে অবশ্যই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সঙ্গে পরামর্শ করে চালের বাজারে প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হতে পারে। নির্ধারিত দামের বেশি মূল্যে চাল বিক্রি করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে খাদ্যমন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারির পরও বাজারে এর কোনো প্রতিফলন নেই। মোটা চালের অনুপস্থিতিতে সব ধরনের চিকন চালের দাম বেড়েছে কেজিতে চার থেকে ছয় টাকা। ৫৬ টাকা কেজি মিনিকেট বা নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৬২ টাকা কেজি। পর্যাপ্ত উৎপাদন, যথেষ্ট মজুদ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি না থাকার পরও চালের মূল্যবৃদ্ধিতে সরকার বিব্রত।
এদিকে লাগামহীন চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী ভূমিকা পালনের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। তবে বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দিন বলেছেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা কোনো উদ্যোগ নেবেন না। তিনি মনে করেন, চালের বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব খাদ্য মন্ত্রণালয়ের। তবে সচিব জানান, খাদ্য মন্ত্রণালয় চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহযোগিতা নিতে পারবে। এ প্রসঙ্গে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমানারা খানুম বলেন, ‘মিলগেটে মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার এখতিয়ার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় তা করেছে।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest