শনিবার, ১৫ মে ২০২১, ০১:১২ পূর্বাহ্ন

সোর্সের অপকর্মে বিপদে পুলিশ সদস্যরাও

সোর্সের অপকর্মে বিপদে পুলিশ সদস্যরাও

বিশেষ সংবাদদাতা :
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবী থানায় ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন। পুলিশ সোর্স রিয়াজুল শক্তিশালী বোমাটি নাড়াচাড়া করার সময় ঘটে বিস্ফোরণের ঘটনা। এ ঘটনার পর ওই থানার কয়েকজন কর্মকর্তাকে বদলি হতে হয়।

সাড়ে ছয় বছর আগে একই থানায় পুলিশি হেফাজতে জনি নামের এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনায় চলতি মাসে তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেন আদালত। ওই ঘটনার মূলেও আছে দুই সোর্সের অপকর্ম।

সাম্প্রতিক এমন কয়েকটি ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় আসে পুলিশ তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘সোর্সের’ অপকর্মের বিষয়টি। এর আগে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিরপুরের শাহআলী থানা এলাকায় চাঁদা না দেয়ায় চা দোকানি বাবুল মাতুব্বরকে পুলিশের সামনেই পুড়িয়ে মারে তাদের সোর্স দেলোয়ার, আয়ুব আলী ও রবিনসহ কয়েকজন।

ভুক্তভোগীরা জানান, রাজধানীসহ দেশের অনেক এলাকায় চাঁদা না দিলে ও ব্যক্তিগত বিরোধ থাকলে তুচ্ছ কারণে সাধারণ মানুষকে মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে পুলিশ সোর্সরা। নানা অপরাধে নিজেরা জড়িত থাকলেও এরা পুলিশের ক্ষমতায় বলীয়ান। ফলে তাদের সঙ্গে অনেকেই বিরোধে যান না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিস্তর অভিযোগের পরও প্রযুক্তির যুগেও পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না পুলিশের বিতর্কিত এই ‘সোর্স’ বা স্থানীয় ভাষায় ‘ফর্মা’ কালচার। মাঠ পর্যায়ের একশ্রেণির অসাধু পুলিশ কর্মকর্তার প্রশ্রয়ে ভয়ঙ্কর এসব সোর্স মাদক কারবার, ফুটপাতে চাঁদাবাজি, হত্যা ও অপহরণসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এদের অনেকের নামে রয়েছে পুরনো মামলা। অপরাধ সম্পর্কে জানতে, অপরাধী ধরতে ও তদন্তে তথ্য সংগ্রহ করতে ‘কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার’ এই পুরনো কৌশল বেশির ভাগ থানা এলাকায় এখনো চলমান।

ভুক্তভোগী ও জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এ জাতীয় সোর্সরা একদিকে নিজেরা দিনে দিনে ভয়ঙ্কর কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে, অন্যদিকে কালিমালিপ্ত করছে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। তাদের অপকর্মে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ফেঁসে যাচ্ছেন। আবার অনেক সময় পুলিশ জেনেশুনে সোর্সদের দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি করার অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে পুলিশের ‘সোর্স মানি’ কিংবা ‘অপারেশন মানি’ কারা পান এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকার থেকে এ জন্য পুলিশকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। এই টাকা থানার এসআই থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাওয়ার কথা। কিন্তু বছরের পর বছর এসপি পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এই ‘সোর্স মানি’ নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করে আসছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি ‘সোর্স মানি’ না পেয়ে তথ্য সংগ্রহের জন্য থানার কর্মকর্তারা বিভিন্ন উপায়ে টাকা সংগ্রহ করেন। এসআই পর্যায়ে পছন্দের কর্মকর্তা ছাড়া বাকিদের কম দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক দলের কর্মী, বিভিন্ন ছোট অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, জেল থেকে ছাড়া পাওয়া দাগী আসামি, স্থানীয় বাসিন্দা, বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তিসহ সাধারণ মানুষকে সোর্স হিসেবে ব্যবহার করে পুলিশ। তদন্ত, বিভিন্ন অপরাধের তথ্য ও অপরাধীদের শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অনেক সময় সাধারণ মানুষের সহযোগিতা নিয়ে থাকেন। এদের ‘সোর্স’ বা ‘ফর্মা’ বলা হয়ে থাকে। নিয়মিত তথ্যদাতারাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ‘সোর্স’।

অনুসন্ধানে জানা যায়, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মাঝে মাঝে একসময়ের অপরাধীদের সোর্স হিসেবে বাছাই করে সংশোধনের সুযোগ দেন।
কিন্তু এ সোর্সদের বেশির ভাগই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্ষমতা দেখিয়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে এবং কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে আটকের ভয় দেখাচ্ছে। কেবল তা-ই নয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে চলাফেরার কারণে সাধারণ মানুষও তাদের নিয়ে আতঙ্কে থাকে। এই সোর্সদের যাবতীয় অপকর্মে প্রশ্নবিদ্ধ হয় পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক ভালো কর্মকাণ্ড।

পুলিশি হেফাজতে ইশতিয়াক আহমদে জনি নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার দায়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর পল্লবী থানার এসআই জাহিদুর রহমান জাহিদসহ তিন পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। এ ছাড়া মামলার অপর দুই আসামি পুলিশ সোর্স সুমন ও রাসেলকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।
সাড়ে ছয় আগে ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনে বন্ধুর গায়ে হলুদ অনুষ্ঠানে পুলিশের সোর্স সুমন ও রাশেদের অশালীন আচরণের প্রতিবাদ করায় জনি ও তার ভাই ইমতিয়াজকে পল্লবী থানায় নিয়ে রাতভর পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

এদিকে রাজধানীর পল্লবী থানায় গত ২৯ জুলাই সকালে যে ভয়াবহ বোমাটি বিস্ফোরিত হয়, সেটি ভবনের দোতলায় পরিদর্শক ইমরানুল ইসলামের কক্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন পুলিশের সোর্স রিয়াজুল।

২৭ জুলাই সন্ধ্যায় একটি ব্যাগে করে তিনি বোমাটি সেখানে নিয়ে যান। ঘটনার দিন ইমরানুলের কক্ষে পুলিশ সোর্স রিয়াজুল ব্যাগ থেকে ওজন মাপার যন্ত্র থেকে একটি বোমা বের করে নাড়াচাড়া করার সময় বিস্ফোরিত হয় বলে পুলিশি তদন্তেই উঠে এসেছে।

সোর্সের দৌরাত্ম্য এতই বেশি যে, ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মিরপুরের শাহআলীতে চাঁদার দাবিতে প্রতিবন্ধী চায়ের দোকানি বাবুল মাতুব্বরকে পুলিশের সামনেই পুড়িয়ে মারে সোর্সরা। এ ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বরখাস্ত ও তৎকালীন ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়।

জানা যায়, কয়েক বছরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আট বিভাগের উপ-কমিশনারসহ (ডিসি) সংশ্লিষ্টদের বেশ কয়েকবার চিঠি দেয়া হয় তথাকথিত সোর্স কালচার থেকে বেরিয়ে আসার জন্য। বিভিন্ন থানায় ডিসিরা কঠোর নির্দেশও দেন এ বিষয়ে।

মাঠ পর্যায়ে এমন নির্দেশনাও দেয়া হয়, যদি কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে বা গাড়িতে সোর্সকে ঘুরতে দেখা যায়, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, যত মামলা হয় তার ৯০ ভাগ মামলার রহস্যই পুলিশ নিজেরা উদ্ধার করে। ১০ ভাগেরও কম ক্ষেত্রে সোর্সদের সহায়তা নেয়া হয়। থানা পর্যায়ে কিছু অসাধু কর্মকর্তা এসব সোর্স কাম মাদক কারবারিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগীদের তথ্য মতে, মিরপুর থানার সোর্স চোরা সুজন নিজেকে এসআই দাবি করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করছেন। ভাষানটেক ও কাফরুল থানার পুলিশ সোর্স শাওনের বিরুদ্ধেও রয়েছে একই অভিযোগ।

অন্যদিকে কদমতলী-শ্যামপুর এলাকায় সোর্স হিসেবে টাক্কু রশিদের রয়েছে ব্যাপক পরিচিতি। তার বিরুদ্ধে মাদক বিক্রি ও জুয়ার বোর্ড চালানোসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে।

সূত্র জানায়, লালবাগ থানার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি সোর্স অসীম ও তার সহযোগীরা হাজারীবাগ এলাকার সুইপার কলোনিতে মাদকের কারবার করছেন। অপরদিকে লালবাগ থানার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী সাহাবুদ্দিন ওরফে বুদ্দিন বর্তমানে মতিঝিল ও সূত্রাপুর থানার সোর্স বলে নিজেকে পরিচয় দেন।

আর খিলগাঁও থানা পুলিশের সোর্স ওহাব গোড়ান এলাকার ছাপড়া মসজিদের পাশে আদর্শবাগের গলিতে ইয়াবা ও ফেনসিডিল ব্যবসা চালান। কামরাঙ্গীরচর এলাকায় পুলিশ সোর্স আজমল প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা চালাচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা ও মাদক মামলা রয়েছে। ২০০৯ সালে নিউ পল্টন জুয়েলারি দোকানে ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পুলিশ সোর্সের খাতায় নাম লেখান তিনি।

মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, পুলিশের সোর্স প্রায়ই নিজ স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সোর্সদের ওপর এত বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে যে, তাদের দেয়া তথ্য যাচাই না করেই অভিযান চালায়। এতে অনেক নিরপরাধ মানুষ মামলার শিকার হয়ে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে যায়।

ডিএমপির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, কাগজপত্রে থানার কোনো সোর্স থাকার কথা নয়। এর পরও বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ পেয়ে একাধিকবার ডিএমপি কমিশনারের কার্যালয় থেকে প্রত্যেক থানায় চিঠি দিয়ে সোর্স নামধারী এসব অপরাধীর ব্যাপারে ওসিদের সতর্ক হতে বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি শহীদুল হক বলেন, পুলিশের সোর্সদের নিয়ন্ত্রণ করা ও প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করার কাজটি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার দায়িত্ব। প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করতে না পারা ও ভ্রান্ত পথে যাওয়া, সোর্সের অপকর্মের দায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার। সোর্সের গতিবিধি, চরিত্র ও মানসিকতা বুঝতে হবে।

তিনি আরো বলেন, সোর্সই যদি ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে সেটা ওই কর্মকর্তার সমস্যা। এখানে বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সোর্স নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

টার্গেটে পড়েন সোর্সরাও: অন্যদিকে পেশাদার সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের ধরিয়ে দেয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে টার্গেটেও পরিণত হন সোর্সরা। এ মাসের প্রথম সপ্তাহে মাদক কারবারিদের রোষানলে পড়ে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন র‌্যাবের সোর্স আবুল কাসেম। গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঘটে এই ঘটনা।

এ ছাড়া অতীতে ঢাকায় বেশ কয়েকজন সোর্সকে খুনের ঘটনা ঘটে। ২০১৬ সালের ২৩ মে টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের টিঅ্যান্ডটি গেট এলাকায় পুলিশের সোর্স কুতুব উদ্দিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মাদক ব্যবসায়ীদের ধরিয়ে দেয়ায় একই বছরের ৬ মে টঙ্গীর এরশাদনগরে পুলিশের সোর্স রাসেল মিয়াকে খুন করা হয়। ওই বছরের ২২ মে খুন হন পুলিশের আরেক সোর্স মমিন।

 


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest