বুধবার, ১৬ Jun ২০২১, ০২:১৪ পূর্বাহ্ন

সারাদেশে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং

সারাদেশে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং

খায়রুল আলম রফিক :
সারাদেশে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাং। অপহরণ, ধর্ষণ এবং খুনের মতো ভয়ঙ্কর সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণরা। র‌্যাব ও পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহীতে ৫৬ জন, সাভারে তিনজন এবং নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ১১ জনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। তাদের মধ্যে সাভার ও ফতুল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের কবল থেকে অপহৃত দুইজনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
সাভার : সাভারের আনন্দপুর থেকে হৃদয় (১৮) নামে অপহৃত যুবককে উদ্ধার করে অপহরণের সঙ্গে জড়িত গ্যাংয়ের তিনজনকে আটক করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব-৪) সদস্যরা। গতকাল শনিবার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন র‌্যাব-৪ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও কোম্পানি কমান্ডার জমির উদ্দিন আহমেদ।
এর আগে শুক্রবার দুপুরে সাভার থেকে অপহৃত হয় হৃদয়। পরে শুক্রবার রাত ১২টার দিকে সাভারের আনন্দপুর সিটিলেন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে উদ্ধার ও তিনজনকে আটক করা হয়। উদ্ধার হওয়া হৃদয় মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর থানার মাইশা গ্রামের জাবেদ আলীর ছেলে।
আটকরা হলো- মুসা কাজী (১৯), জাহিদ হাসান (১৯) ও আশিক হোসেন (১৮)। তারা সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
র‌্যাব-৪ জানায়, শুক্রবার দুপুরে পারিবারিক কাজে সাভারে আসেন হৃদয়। পরে সন্ধ্যায় হৃদয়ের মোবাইল ফোন থেকে তার বাবা আলীর কাছে ফোন দিয়ে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। মুক্তিপণ না পেলে হৃদয়কে হত্যার হুমকিও দেয় তারা। বিষয়টি র‌্যাব-৪ কে জানালে শুক্রবার রাত ১২টার দিকে ভুক্তভোগীর মোবাইল নম্বর ট্র্যাক করে সাভারের আনন্দপুরে অভিযান চালিয়ে হৃদয়কে উদ্ধারসহ মুসা কাজী, জাহিদ হাসান ও আশিককে আটক করা হয়।
র‌্যাব-৪ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও কোম্পানি কমান্ডার জমির উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, আমরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পেরেছি অপহরণকারীরা অত্র এলাকায় বিভিন্ন সময় নানা অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত। সেইসঙ্গে মানুষকে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে তারা।
নারায়ণগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জ থেকে মো. মামুন মিয়া জানান, ফতুল্লা থেকে কিশোর গ্যাংয়ের অপহরণকারী চক্রের ১১ জনকে আটক করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-১১)। গতকাল শনিবার বিকালে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান র‌্যাব-১১ এর সিনিয়র এএসপি সুমিনুর রহমান।
শুক্রবার রাতে ফতুল্লা মডেল থানাধীন চাঁনমারী মাউরাপট্টি সেকশন মাঠ এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের ১১ জনকে আটক করা হয়। তারা হলো- রাসেল মিয়া ওরফে রাসেল (১৮), জালাল (১৮), আমিনুল ইসলাম (২৩), জনি ওরফে শফিকুল ইসলাম (১৮), জাকির হোসেন ওরফে জাকির (১৮), আনোয়ার (১৮), জুয়েল রানা (২২), আবু নাঈম (১৮), ফেরদৌস ইসলাম (১৮), আবদুল্লাহ ওরফে শুভ (২৪) ও সাইফুল ইসলাম ওরফে শান্ত (১৮)।
আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ ও প্রাথমিক তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, আটক সবাই দুষ্কৃতিকারী এবং কিশোর গ্যাং গ্রুপের। তারা দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পিতভাবে দলবদ্ধ হয়ে সংঘাত সৃষ্টি ও জনমনে ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে আসছিল। এছাড়া ওই এলাকায় কোনো অপরিচিত লোক এলে তাকে জিম্মি করে মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিতো।
৮ অক্টোবর কিশোর গ্যাং গ্রুপের ওই সদস্যরা অপর এক কিশোরকে অপহরণ করে চাঁনমারী মাউরাপট্টি সেকশন মাঠ এলাকায় একটি পরিত্যক্ত ভবনে আটকে রাখে এবং মারধর করে তার কাছ থেকে তিন হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয়। পরবর্তী সময়ে অপহৃতের মায়ের কাছ ফোন করে ৪০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করে; মা ১০ হাজার টাকা দেবে বলে জানান।
তারপর অপহৃতের মা র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব-১১ ঘটনার সত্যতা পেয়ে শুক্রবার রাতে অপহৃতকে উদ্ধার করে ওই কিশোর গ্যাংয়ের ১১ জনকে আটক করে। তাদের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় আইনানুগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন বলে জানায় র‌্যাব।
রাজশাহী: রাজশাহী থেকে পরিতোষ চৌধুরী আদিত্য জানান, রাজশাহীতে নানা ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোর ও তরুণরা। ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত এবং খুনের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তারা। অনেকেই মাদকের টাকা জোগাড় করার জন্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এসব কিশোর অপরাধীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। বর্তমান সময়ের আলোচিত ও ভয়ঙ্কর সব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কিশোর গ্যাংয়ের ৫৬ সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের ১২ থানায় গত ২৪ ঘণ্টায় এক যোগে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৫৬ জন কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করে। এর মধ্যে ৩২ জনকে মুচলেকা নিয়ে তাদের অভিভাবকের কাছে তুলে দেওয়া হয় ও বাকি ২৪ জনের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এ অভিযান আরো জোরালো হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার গোলাম রুহুল কুদ্দুস জানান, কিশোর গ্যাং সারা দেশে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। তারা পাড়া-মহল্লার প্রভাবশালী, মাস্তান বা বড় ভাইদের হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা একসঙ্গে মাদকসেবন, পাড়া-মহল্লায় নারীদের উত্ত্যক্ত করাসহ ছোট ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারি এবং ঝগড়া বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় খুন-ধর্ষণের মতো ঘটনাও ঘটছে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য অপরাধ করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা বিভিন্ন গ্রুপ তৈরি করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করছে এবং পরিকল্পনা করছে। এ পরিস্থিতিতে পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে কিশোর গ্যাং ও কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান শুরু করেছে আরএমপি। এ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ১২ থানাধীন বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ৫৬ কিশোর গ্যাং সদস্যদের আটক করা হয়। আটককৃতদের থানায় এনে যাচাই-বাছাই করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ৩২ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়। বাকিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযান চলতে থাকবে এবং এসব কিশোর গ্যাং কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest