বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০, ০৯:২৯ অপরাহ্ন

সাইবার অপরাধের পাহাড়: আলাদা থানা হবে শিগগিরই

সাইবার অপরাধের পাহাড়: আলাদা থানা হবে শিগগিরই

স্টাফ রিপোর্টার:  সাইবার অপরাধ বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় বাড়ছে ইন্টারনেট ব্যবহার। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ। বেপরোয়া হয়ে উঠছে সাইবার অপরাধীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে জমা পড়ছে শতশত অভিযোগ। ছোটখাটো ঝামেলা, সম্পর্কে টানাপোড়েন হলেই প্রেমিকার আপত্তিকর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে তরুণরা। এমনকি স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হলে তাকে অনলাইন মাধ্যমে হেনস্ত করছে স্বামী। পুলিশ বলছে, শিক্ষিত লোকজনের মধ্যেই এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা বেশি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশে অবস্থানরত অবৈধ বিদেশীরা। সম্প্রতি এমন বেশ কয়েজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে সাইবার অপরাধ দমনে এবার সরকার গ্রহণ করেছে বহুমুখী উদ্যোগ। ইতোমধ্যে চালু হয়েছে সাইবার ট্রাইব্যুনাল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে গঠন করা হয়েছে সাইবার ইউনিট। প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। শিগগিরই চালু করা হবে সাইবার থানার কার্যক্রম।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, দেশে সাধারণত ১৩ ধরনের সাইবার অপরাধের ঘটনা ঘটছে। এগুলো হচ্ছে পারিবারিক বিদ্বেষ সৃষ্টি, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া, বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে বিরোধ তৈরি, উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য প্রচার, ইউটিউবে অন্তরঙ্গ ভিডিও ও ছবি আপলোড, ফেক এ্যাকাউন্ট তৈরি, পাসওয়ার্ড বা গোপন নম্বর অনুমান করে আইডি হ্যাক, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি, অনলাইন এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং), অনলাইনে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং অনলাইন গ্যামব্লিং (জুয়া)। সাইবার ক্রাইম বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, আগে সাইবার ক্রাইম বিষয়ক বেশি অভিযোগ আসত নারীদের কাছ থেকে। কিন্তু এখন সমান্তরালভাবে পুরুষরাও সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছেন।

পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিডিএমএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সাইবার অপরাধের ঘটনায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় তিন হাজার ৬৫৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ৫৭৫টি সাইবার ট্রাইব্যুনালে গেছে। নিষ্পত্তি হয়েছে ৫২২টির।

ভুক্তভোগীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের ল-ফুল ইন্টারসেপশন সেল (এলআইসি), ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল (সিসিটিসি) ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি এ্যান্ড ক্রাইম বিভাগ, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবি আই), র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) সাইবার অপরাধ তদন্তবিষয়ক সেল, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সাইবার হেল্প ডেস্ক এবং ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) কাজ করে। তবে মামলার তদন্ত করেছে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বছর সারাদেশের বিভিন্ন থানা থেকে ৭২১টি মামলা বিচারের জন্য সাইবার ট্রাইব্যুনালে এসেছে। চলতি বছর এর সংখ্যা অনেক বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে ২০১৮ সালে এসেছিল ৬৭৬টি, ২০১৭ সালে ৫৬৮টি, ২০১৬ সালে ২৩৩টি, ২০১৫ সালে ১৫২টি, ২০১৪ সালে ৩৩টি এবং ২০১৩ সালে এসেছে তিনটি মামলা। ক্রমেই মামলার সংখ্যা বাড়ছে। গত বছরের মোট অভিযোগের ৫৩ শতাংশ এসেছে পুরুষদের কাছ থেকে, বাকি ৪৭ শতাংশ এসেছে নারীদের কাছ থেকে।

সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন দেশের নামী-দামী তারকারা। তারকাদের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটারসহ ইউটিউবেও তাদের নিয়ে বহু কুরুচীপূর্ণ মন্তব্য করছে কতিপয় বিকৃত মানসিকতার মানুষ, যা শিল্পীর মানসিক অবস্থাকে বিপর্যস্ত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভেতর ফেসবুক সবচেয়ে জনপ্রিয়। তাই বাংলাদেশের তারকারা সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত হন ফেসবুকে। অনেকে কেবল বুলিংয়ের শিকার হয়ে কাজের আগ্রহও হারিয়ে ফেলেছেন।

এডিশনাল আইজি ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান আজকালের খবরকে বলেন, বর্তমানে সময়ে সাইবার ক্রাইমের ট্রেন্ড চলছে। ব্যক্তিগত ছবি সোশ্যাল মিডিয়াতে নিয়ে আসে। প্রেমিক কিংবা স্বামীও হয়রানি করার জন্য বেছে নিচ্ছেন এই মাধ্যম। বনিবনা না হলেই ফেসবুকে আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ছেড়ে দিচ্ছেন।

সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের মতো দেশের অধিকাংশ জনগণ সেলফ কোয়ারেন্টাইনে থাকলেও থেমে নেই ভার্চ্যুয়াল জগৎ। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও পাঠদান চলছে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম বাড়িতে থেকেই চলমান রাখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্রের আদান-প্রদান হচ্ছে ই-মেইলে। অনলাইনভিত্তিক কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীদের বাসায় থেকেই কাজ চালিয়ে নিতে বলছে। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে চলছে জরুরি ব্যাংকিং কার্যক্রম। দৈনন্দিন কেনাকাটা চলছে অনলাইন শপের মাধ্যমে। আর অধিকাংশ মানুষ সময় কাটাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এই বাস্তবতায় সাইবার অপরাধীদের অন্যতম লক্ষ্যবস্ত এখন ছোট-বড় ই-কমার্স সাইট, অনলাইন ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্ম, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ই-মেইল অ্যাকাউন্ট ইত্যাদি। ম্যালওয়্যার, ফিশিং ও বিকাশের মাধ্যমে প্রতারণা নানা ফাঁদ পাতছেন তারা।


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest