সোমবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২১, ০১:৪৫ পূর্বাহ্ন

বিআইডব্লিউটিএতে বদলি ও ইজারা বাণিজ্য

বিআইডব্লিউটিএতে বদলি ও ইজারা বাণিজ্য

নিউজ ডেস্ক:  রাজধানীর মতিঝিলে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয়ের একটি সুসজ্জিত কক্ষ দখল করে রেখেছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহযোগী সংগঠন পরিচয়ে গজিয়ে ওঠা প্যাডসর্বস্ব সংগঠন ‘মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড’। বিলাসবহুল এই কক্ষ অনৈতিকভাবে দখলে রেখে নানা দুর্নীতি-অনিয়ম করছেন সংস্থার বন্দর ও পরিবহন বিভাগের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী নাজমুল হুদা। অভিযোগ, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সদস্য সচিব এবং বিআইডব্লিউটিএর সিবিএর এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক পরিচয় দিয়ে তিনি বিভিন্ন অপকর্ম অব্যাহত রেখেছেন।

বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী, বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবরে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিআইডব্লিউটিএর বর্তমান চেয়ারম্যান কমডোর গোলাম সাদেক অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নিতে সংস্থাটির সচিব আবু জাফর হাওলাদারকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশের পরও চলে গেছে প্রায় এক মাস। কিন্তু নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। সচিব অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন, বিষয়টি ‘খতিয়ে দেখে’ উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিআইডব্লিউটিএর প্রধান কার্যালয়ের চার তলায় ৩৫০ বর্গফুটের একটি কক্ষ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বিআইডব্লিউটিএর প্রাতিষ্ঠানিক ইউনিট কার্যালয়ের নামে অনেক আগে বরাদ্দ হয়েছিল। ২০১৭ সালের মার্চ মাসে ‘মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড’ প্রাতিষ্ঠানিক ইউনিটের একটি নামসর্বস্ব আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। পরে নামসর্বস্ব এই সংগঠনের আহ্বায়ক দেওয়ান সেতাবুর রহমান ও সদস্য সচিব নাজমুল হুদার লিখিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ২০ এপ্রিল বিআইডব্লিউটিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান কমডোর এম মোজাম্মেল হোসেন সংসদের নামে বরাদ্দ করা কক্ষটিই মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডকে কার্যালয় হিসেবে সাময়িকভাবে ব্যবহারের অনুমতি দেন।

এরপর থেকে এখনও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ও সুসজ্জিত কক্ষটি অনৈতিকভাবে দখলে রেখেছেন নাজমুল হুদা। সংগঠনের আহ্বায়ক ও সংস্থার ড্রেজিং বিভাগের সহকারী দেওয়ান সেতাবুর রহমানের নিষ্ফ্ক্রিয়তার সুযোগে বর্তমানে কক্ষটি বন্দর ও পরিবহন বিভাগের সহকারী নাজমুল হুদার একক দখলে রয়েছে। অথচ দেশের অন্য কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানে ‘মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড’ নামে কোনো সংগঠনের অফিস কক্ষ নেই। ইতোমধ্যে সরকার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের কমিটি বিলুপ্ত করে সংগঠনটি পরিচালনার জন্য প্রশাসক নিয়োগ করেছে। তাই মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহযোগী সংগঠন পরিচয় দিয়ে কক্ষটিকে দখলে রাখার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ, কক্ষটি মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের নামে দখলে নেওয়ার ক্ষেত্রে নাজমুল হুদাকে সরাসরি সহযোগিতা করেন বিআইডব্লিউটিএর সিবিএ সভাপতি আবুল হোসেন। বেআইনিভাবে ও পেশিশক্তির জোরে সিবিএর এক নম্বর যুগ্ম সম্পাদক সঞ্জীব দাসকে বহিস্কার করে শ্রম আইন অমান্য করে নাজমুল হুদাকে ওই পদে মনোনীত করেন তিনি। এজন্য আবুল হোসেন ও নাজমুল হুদার মধ্যে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, নাজমুল হুদা বন্দর ও পরিবহন বিভাগের কর্মচারী হলেও নিজের দপ্তরে কখনও বসেন না। সারাক্ষণ থাকেন চতুর্থ তলায় মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের নামে দখলে রাখা কক্ষে। কক্ষটির প্রতি মাসের বিদ্যুৎ বিল ও অফিসের দু’জন পিওনের বেতন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিআইডব্লিউটিএর কোষাগার থেকেই দেওয়া হচ্ছে।

নাজমুল হুদা কক্ষটিতে বসে সংগঠন ও বিআইডব্লিউটিএর সিবিএর পদ-পদবি ব্যবহার করে সারাদেশের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপরও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। কর্মচারীদের বদলি ও পছন্দের ব্যক্তিদের নামে সংস্থার বিভিন্ন ঘাট ইজারা দেওয়ার ব্যবস্থা করে প্রতি বছর লাখ লাখ টাকা আয় করছেন। এ বছরও তিনি সিলেটের ছাতক, বিয়ানীবাজার ও নবীনগরে সাত-আটটি ঘাট ইজারা দেওয়ার মাধ্যমে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা আয় করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড ও বিআইডব্লিউটিএর বিভিন্ন শাখা কমিটি গঠনের নামেও প্রতিটি কমিটির নেতাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, কক্ষটিতে বসে নাজমুল হুদা তার সহযোগীদের নিয়ে নিয়মিত মদ-গাঁজা-ফেনসিডিলের আসর বসানোর কারণে অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন।

অভিযোগ, নাজমুল হুদা রাজনৈতিকভাবে বিএনপি-জামায়াতের কট্টর সমর্থক হলেও বর্তমানে ভোল পাল্টে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের সদস্য সচিব বনে গেছেন। ২০১২ সালের জুলাই মাসে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় বিআইডব্লিউটিএর পিওন থেকে সহকারী (কেরানি) পদে চাকরি নেওয়ার পর থেকেই তিনি নিজেকে ‘সরকার সমর্থক’ পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অথচ নিকট অতীতেও নাজমুল হুদা তার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে টাইমলাইনে যেসব পোস্ট দিয়েছেন ও মন্তব্য করেছেন, তা থেকে তার রাজনৈতিক আদর্শ স্পষ্ট। এমনকি বিএনপি-জামায়াতের দেওয়া সরকারবিরোধী অনেক পোস্টও শেয়ার করেছেন তিনি। অবশ্য পরে এসব পোস্ট টাইমলাইন থেকে ডিলিট করেও দিয়েছেন। তবে এসব পোস্টের স্ট্ক্রিনশট সমকালের সংগ্রহে রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড সংগঠনটির পক্ষ থেকে তাকে কখনও ১৫ আগস্টে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় না। ওই দিন বিআইডব্লিউটিএর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতেও সশরীরে অংশ নেন না তিনি।

ক্ষুব্ধ কয়েকজন কর্মচারী জানান, সরকারি দপ্তর ও সংস্থাগুলোতে কর্মরত নারীদের শিশুসন্তানদের জন্য ‘ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার’ ও ‘ডে কেয়ার সেন্টার’ স্থাপনের জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশনা থাকলেও অতিরিক্ত কক্ষ না থাকায় বিআইডব্লিউটিএর মতিঝিল প্রধান কার্যালয়ে এই সেন্টার াপন করা সম্ভব হয়নি। অথচ একটি ভুঁইফোঁড় সংগঠন তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে একটি সুসজ্জিত কক্ষ অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। এ নিয়ে সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

নাজমুল হুদা অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে সমকালকে বলেন, কক্ষটি ৩০-৩৫ বছর ধরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রাতিষ্ঠানিক ইউনিট কমান্ডের নামে বরাদ্দ ছিল। সংসদের নেতারা বর্তমানে না থাকায় তাদের সম্মতি এবং বিআইডব্লিউটিএর সাবেক চেয়ারম্যানের লিখিত অনুমতি নিয়েই কক্ষটি ব্যবহার করছেন তারা। তবে সংস্থারই ‘একটি পক্ষ’ চাচ্ছে না কক্ষটিতে তারা থাকুন। তাই নানা মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালিয়ে তারা সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডকে উচ্ছেদ করতে চাচ্ছেন।

কক্ষে বসে ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তার, বদলি ও ঘাট ইজারা বাণিজ্য, মাদকের আসর বসানোসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ অস্বীকার করে নাজমুল হুদা বলেন, সংগঠন ও পদ-পদবি ব্যবহার করে তিনি কখনও কোনো রকমের অন্যায় কাজ করেননি। সেটা করার সুযোগও নেই।

ফেসবুকে নিজের টাইমলাইন থেকে আপত্তিকর ও সরকারবিরোধী স্ট্যাটাস দেওয়ার ও পোস্ট শেয়ার করার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন নাজমুল হুদা। তিনি দাবি করেন, ‘এগুলো তো এডিট করেও বানানো যায়। একজন সচেতন ফেসবুক ইউজার হিসেবে এমন কোনো পোস্ট ও শেয়ার নিশ্চয়ই আমি করব না, যাতে বিতর্ক সৃষ্টি হতে পারে। এটুকু জ্ঞান অন্তত আমার আছে।’ ২০১৮ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের ব্যানারে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তখনকার নৌপ্রতিমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সংগঠনের বৈধ স্বীকৃতি না থাকলে নিশ্চয় তারা এই অনুষ্ঠানে আসতেন না।’


Comments are closed.

© All rights reserved © 2017 24ghontanews.com
Desing & Developed BY ThemeForest